ইসলামের সূর্য আমাকে পরিণত করেছে বসন্তের এক প্রাণোচ্ছ্বল নব কিশলয়ে

ইসলামের সূর্য আমাকে পরিণত করেছে বসন্তের এক প্রাণোচ্ছ্বল নব কিশলয়ে

ইসলামের সূর্য আমাকে পরিণত করেছে বসন্তের এক প্রাণোচ্ছ্বল নব কিশলয়ে

জার্মানী নও-মুসলিম তানিয়া পোলিং
জার্মান যুবতী তানিয়া পোলিং। পাশ্চাত্যের আর দশটা নারীর মতোই ছিল তার উচ্ছৃঙ্খল জীবন। তার কাছে জীবনের অর্থ ছিল, খাও দাও ফুর্তি কর। কিন্তু হামবুর্গের একটি বিপণী কেন্দ্রে হিজাব পরিহিতা একজন মুসলিম নারী তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। এ নারীকে লক্ষ্য করে তিনি এবং তার কয়েকজন বান্ধবী হিজাব নিয়ে উপহাস করে বলেছিলেন, ‘অসুস্থ রোগীর মতো এ কী পোশাক তুমি পরেছ?’ কিন্তু ঐ মহিলা এর উত্তরে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘এ পোশাকই মানসিক সুস্থতা ও ভারসাম্যের নিদর্শন এবং হিজাবই নারীকে দেয় স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তা’। এরপর তারা নিজ নিজ পথে ফিরে গেল। কিন্তু সামান্য এই বাক্যই তানিয়া পোলিংয়ের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। তিনি বলেন, সেই মহিলার বক্তব্য নিয়ে বহুদিন ধরে ভাবনায় মগ্ন থাকলাম। অবশেষে আমি বিভিন্ন দেশের মুসলিম ভাই-বোনদের সাথে কথা বলে উপলব্ধি করলাম যে, হিজাব নারীর জন্য কোন সীমাবদ্ধতা তৈরীই করে না, বরং তাদেরকে সমাজে বেশি বেশি কাজ করার সুযোগ ও সুস্থ উপস্থিতির নিরাপত্তা দেয়।’
আমি বুঝতে পারলাম, কেবল বস্তুগত সম্পদের প্রাচুর্য মানুষকে দেয় না কাঙ্খিত সুখ ও প্রশান্তি। আধ্যাত্মিকতামুক্ত ও ধর্মহীন পরিবেশে ব্যাপক সম্পদ ভোগ করেও মানুষ যে সুখী হয় না তার প্রমাণ হ’ল পাশ্চাত্যের জনগণের প্রশান্তিহীনতা। পশ্চিমা মতাদর্শের মূল কথাই হল, পার্থিব জীবন ভোগের জীবন। মৃত্যুর পরে কিছুই নেই। এ বিষয়টি পশ্চিমাদেরকে উদ্দেশ্যহীনতার যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইসলাম বলে, মৃত্যুই মানুষের জীবনের শেষ কথা নয়। পরকালে থাকবে সৎ কাজগুলোর জন্য অশেষ পুরস্কার। আর এই চিন্তা নিয়ে ধার্মিক মানুষেরা বেশি বেশি ভাল কাজ করেন। ফলে মৃত্যু নিয়ে তারা শঙ্কিত থাকেন না।
তানিয়া পোলিং বলেন, ‘আমি যেন বিশ বছরের এক সুদীর্ঘ অন্ধকার রাত কাটিয়েছি এবং এরপর আমার জীবনে এসেছে সূর্যোদয়। ইসলামের সূর্য আমাকে পরিণত করেছে বসন্তের এক প্রাণোচ্ছ্বল নব কিশলয়ে, যে কিশলয় জেগে উঠেছে বিশ বছরের দীর্ঘ শীত-নিদ্রার পর।’
তানিয়া বলেন, ‘আমি এই বাস্তবতা বুঝতে পেরেছি যে, ইসলাম নারীকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে তাদের মহৎ প্রকৃতি ও আত্মার কারণে, শরীরের কারণে নয়। তিনি বলেন, ইসলামের অন্যান্য দিক যেমন আল্লাহর সঙ্গে মুসলমানদের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক, মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক আন্তরিক সম্পর্ক এগুলিও আমার কাছে চরম বিস্ময়কর ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সংহতির কোন ভৌগোলিক সীমারেখা বা জাতিগত সীমানা আমি খুঁজে পাইনি। মুসলমানরা সবাই একই লক্ষ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। এভাবে যতই মুসলমানদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বাড়ছিল ততই তাদের প্রতি আমার সম্মান ও ভালোবাসা বাড়তে থাকে। অবশেষে আমি এটা অনুভব করলাম যে, আমি তো নিজেই মুসলমান হয়ে গেছি।’
তিনি পশ্চিমা সমাজ সম্পর্কে বলেছেন, পশ্চিমাদের মধ্যে মানবীয় ও ¯েœহময় সম্পর্ক খুবই দুর্বল হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে বাহ্যিকভাবে পরিবার ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও সবাই যেন একাকিত্ব অনুভব করছে ও একাকী জীবন যাপন করছে। মুসলমান হওয়ার পর আমি নানা সমস্যার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও বাবা-মায়ের সঙ্গে জীবন যাপন করাকেই এখনও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমি মুসলমান থাকার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং আমার বাবা-মাও বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। এমনকি তারা আমার ইসলামী আচার-আচরণকে আমার অতীতের আচরণের চেয়ে বেশি পসন্দনীয় বলে মনে করেন। আমি অবসর সময়ে অন্য যে কোন কাজের চেয়ে পবিত্র কুরআন এবং জার্মান ভাষায় অনূদিত ধর্মীয় বই-পুস্তক বেশি অধ্যয়ন করি।
তানিয়া পোলিং মনে করেন তিনি যা যা হারিয়েছেন তার বিনিময়ে নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। সব কিছু থাকলেও প্রভূর সঙ্গে সম্পর্ক না থাকার কারণে বাস্তবে কোন কিছুই না থাকার বেদনা বা অস্তিত্বহীনতার বেদনা অনুভব করতেন। কিন্তু এখন প্রভূকে পেয়ে এর মাঝেই যেন সবকিছু খুঁজে পাচ্ছেন। তিনি এখন পেয়েছেন আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা ও আত্মার মুক্তি, আত্মিক প্রশান্তি এবং একজন মহত ও পসন্দনীয় নেতা। ইসলাম গ্রহণের ফলে পেয়েছেন পবিত্র কুরআন যা হচ্ছে আল্লাহর দেয়া বিধান এবং এটা তার জন্য সবচেয়ে বড় পুঁজি।

মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে?

মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে?

মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে?

রহিম সাহেব বেসরকারী একটি অফিসের কর্মকর্তা। নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত অফিস করে অভ্যস্ত। পাঁচটার পর যথারীতি অফিসের কাজ গুটিয়ে হটপটটি কাঁধে ঝুলিয়ে বাসা অভিমুখে রওনা হলেন। দোতলা ভলভো সার্ভিসের অপেক্ষায় আছেন কাউন্টারের সামনের সারিতে। আচমকা পেছন থেকে একটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেন। জামা-প্যান্ট ধূলি-ধূসর হয়ে গেল। পেছন ফিরে যেসব শব্দ বা বাক্য তিনি সজোরে উচ্চারণ করলেন, তা সাধারণত কেউই শুনতে চায় না। আর শোনার পর নিস্ক্রিয় থাকে না। ভলভোয় একটু ভদ্রগোছের মধ্যবিত্তরাই চড়ে। তাই কেউই তার অভদ্র শব্দগুলোর জবাব দিল না। ঝগড়াটে মানুষ ঝগড়া করতে না পারলে স্বস্তি পায় না। মনের পোটে প্রাণীটি ভেতরেই রয়ে গেল। অবশেষে বাসায় ফেরার পর বৌয়ের হাতে হটপটটি দেয়ার সময় প্রাণীটি বেরিয়ে এলোঃ
কী ছাইপাঁশ রান্না করো আজকাল, এসব কি খাওয়া যায়? সারাদিনে সামান্য একটু রান্না করবে-তারও এই হাল যত্তোসব। বারেক, বাসু ওরা কোথায়?
বৌঃ নিরুত্তরই থাকলো। কোন কথাই বললো না।
রহিম সাহেব বললো : কথা কানে যায় না?   কোথায় ওরা এদিকে বৌ কাঁদতে কাঁদতে অন্দরে চলে গেল। তার ছেলে দুটি মায়ের রুমে আজ্রাইলের ভয়ে চুপটি মেরে পড়ে আছে। এদিকে বাসায় রহিম সাহেবের বন্ধু এলেন হঠাৎ করেই। তিনি রহিম সাহেবকে তার কূশলাদি জিজ্ঞেস করার সাথে সাথেই জবাব দিলেন, ভালো আর থাকলাম কই, ঘরে-বাইরে সব খানেই অশান্তি আর অশান্তি। তোর ভাবীকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম ছেলেপুলেগুলো কোথায়, সে তার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। দুই বন্ধুর এরকম কথাবার্তার মাঝে রহিম সাহেবের স্ত্রী মেহমানকে সালাম দিয়ে ড্রইংরুমে এলেন। পারস্পরিক কূশল বিনিময়ের পর ভদ্র মহিলা চা আনার কথা বলে ভেতরে যাচ্ছিলেন, এমন সময় রহিম সাহেব টিপ্পনি কেটে বললেন, তোমার যেই চা, ও আর খাওয়া লাগবে না। বরং ফল-টল কিছু দাও। রহিম সাহেবের স্ত্রী লজ্জিত হয়ে অন্দর মহলে চলে গেলেন। এবারে আসুন ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। প্রতিটি মানুষেরই আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব রয়েছে, আত্মমর্যাদা রয়েছে। মর্যাদা এমন একটি ব্যাপার, যা অনেকের কাছেই সম্পদের চেয়েও মূল্যবান। নিকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারীরাই কেবল ধন-সম্পদের লোভে মর্যাদা বা ব্যক্তিত্বকেও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কিন্তু যারা সৎ তারা মর্যাদাকে সব কিছুর উপরে স্থান দেয়। নারীরা স্বভাবতই লজ্জাবতী। সৎ নারীদের কাছে অর্থাৎ লজ্জাশীলা নারীদের কাছে মর্যাদার গুরুত্ব বেশি। স্ত্রীরাও স্বামীদের কাছে একইভাবে মর্যাদা পেতে আশা করে। স্বামীরা যদি তাদেরকে অমর্যাদা কিংবা অপমানিত করে, তাহলে তারা ভীষণ আহত হয়। আর স্ত্রীদের অর্থাৎ নারীদের অনেকেরই স্বভাব হলো, আহত হলেও তা প্রকাশ না করা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তুষের আগুনের মতো ধিকি ধিকি সে আহত হবার বেদনা লালন করতে থাকে। ধীরে ধীরে স্বামীর ব্যাপারে নিস্পৃহ মনোভাব দেখা দেয় এবং ঘৃণা করতে শুরু করে। অথচ স্ত্রী হলো আপনার জীবনসঙ্গিনী, আপনার সেরা বন্ধু, আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ। ফলে সে-ই আপনার কাছ থেকে বন্ধুত্বের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা পাবার অধিকার রাখে। স্ত্রীকে সম্মান করলে তা প্রেম-ভালোবাসায় পরিণত হয়। ফলে স্ত্রীও আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুরক্ত হয়ে পড়বে। এই সম্মান বা মর্যাদা প্রদর্শনের ব্যাপারটি কিন্তু আলাদা কোন আনুষ্ঠানিকতার মতো ঘটনা নয়। বরং উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে সকল কাজে কর্মেই সম্মান প্রদর্শন করা যেতে পারে। যখন বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন, স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিন। অফিসে এসে কাজের ফাঁকে খোঁজ নিন। বাসায় ফেরার পর দরজা খুলতেই তার আগে আপনিই সালাম দিন। সারাদিন কেমন কাটলো, খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হলো কিনা, সন্তানেরা জ্বালাতন করলো কিনা, এসব খোঁজ-খবর নিন। তারপর যতোক্ষণ একত্রে বাসায় থাকেন, সন্তানদের দেখাশোনার দায়-দায়িত্ব পালনে নিজেও অংশ নিন। স্ত্রী আপনাকে নিষেধ করলে আপনি বলুন সারাদিন তো তুমিই জ্বালাতন সহ্য কর। তার খানিকটা আমাকেও নিতে দাও। আপনার স্ত্রী এতে কৃতজ্ঞতায় বিনয়ী হয়ে উঠবে। খাওয়া-দাওয়া করতে বসলেন-তার রান্নাবান্নার প্রশংসা করুন। ঠাট্টা-মশকরা করেও স্ত্রীকে বিদ্রুপ করা বা অসম্মানিত করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। কারণ আপনি ভালোবেসেই যে ঠাট্টা করেছেন এটা সে বুঝবে। সেজন্যে হয়তো কিছু মনে করবে না। তবে মনে মনে হয়তো ঠাট্টাটিকে সে অপছন্দই করতে পারে। কী প্রয়োজন ঠাট্টার পরিবর্তে বরং প্রশংসার কাব্যিক পথ বেছে নিন। মজা যদি করতেই হয়, তাহলে এমন ধরনের রসিকতা করুন, যাতে মজাও পাওয়া যায় আবার সম্মান-মর্যাদায়ও আঘাত না লাগে। কোন মজলিসে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের সমাবেশে কখনই স্ত্রীকে খাটো করে বা অমর্যাদা করে কথা বলবেন না। বরং তাকে সম্মান দিয়ে তাকে প্রশংসা করুন। এতে আপনার বন্ধু মহলেও আপনার স্ত্রীর সম্মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। যার ফলে আপনারা দুজনেই সম্মানিত হবেন। আর পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক দৃঢ় হয়। সেইসাথে দাম্পত্য জীবন ও পরিবারে সুখ-শান্তি ও সৌরভময় এক পরিবেশ বিরাজ করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যারা মহৎ হৃদয় সম্পন্ন একমাত্র তারাই নারীদের সম্মান প্রদর্শন করে। তিনি আরো বলেছেন,  যে পরিবার অর্থাৎ স্ত্রীকে অসম্মান করে, সে নিজের জীবনের সুখ নষ্ট করে ফেলে। রাসূল (সাঃ)-এর এই মহান বাণীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তাঁর সকল উম্মতের উচিত নিজ নিজ স্ত্রীকে সম্মান করা। ইমাম সাদিক (আঃ)ও তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, যে বিয়ে করেছে তার অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হলো স্ত্রীকে সম্মান করা। পারিবারিক সুখ-শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থেই তারা স্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। কিন্তু এই সম্মান দেখানোর বিষয়টি অন্তর থেকে উত্থিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সম্মান ভালোবাসারই প্রকাশ। ফলে ভালোবাসা যেমন অকৃত্রিম হওয়া দরকার, সম্মান প্রদর্শনও ঠিক তাই হওয়া উচিত। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ বিচিত্র ঘটনাবলীর সম্মুখীন হয়। এসব ঘটনা সবসময় সুখকর নাও হতে পারে। অফিসে বিচিত্র মানসিকতার সহকর্মী থাকে। সবাই যে বন্ধু সুলভ হবে তা নাও হতে পারে। ফলে আপনি যদি কারো কাছ থেকে কখনো অবন্ধুসুলভ আচরণ পান, তাহলে আপনার মনটা খারাপ হয়ে থাকতে পারে। তার উপর হয়তো বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেলেন, কিংবা দুর্ভাগ্যবশত: কোন ছিনতাইকারী আপনার সর্বস্ব লুট করে নিল-এরকম অবস্থায় আপনি বিক্ষুদ্ধ মনে বাসায় ফিরলেন। বাসায় ফেরার পর আপনি আর কাউকে না পেয়ে বেচারী স্ত্রীর ওপর মনের ঝাল ঝাড়লেন। আপনার ছেলে মেয়েরা আপনার আচরণ দেখে ভাবলো, বাবা তো নয় যেন এক আজরাইল বাসায় ফিরেছে। তারা আপনার কাছে না ঘেঁষে ভয়ে পালিয়ে বাঁচলো। এদিকে আপনার স্ত্রী আপনার জন্যে সারাদিন খেটে যে রান্নাবান্না করলো, সেই রান্নাবান্নার ছোট-খাটো স্বাভাবিক ত্রুটিতে আপনি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলেন, কিংবা ঘরদোর হয়তো বাচ্চারা অগোছালো করে রেখেছে, কিংবা তারা চেঁচামেচি করছে-যাই হোক না কেন আপনি যদি এসব অজুহাতে আপনার স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করেন, তাহলে এরচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী থাকতে পারে আপনি নিজেই আপনার সংসারকে দোজখে পরিণত করলেন। আপনার এই আচরণ মোটেই অভিভাবক সুলভ নয়, বরং একজন অত্যাচারী স্বৈরাচারের মতো। আপনার মতো স্বৈরাচারের শোষণে আপনার পুরো পরিবার অসহ্য যন্ত্রণার শিকার হচ্ছে। আর আপনার স্ত্রী যে তার স্বামীকে দেখামাত্রই খুশী হয়ে ওঠার কথা ছিল, সে আপনার চেহারা দেখা মাত্রই বিরক্ত হয়ে উঠবে। আপনার সঙ্গই তার কাছে বিষময় মনে হবে। ধীরে ধীরে আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইবে। বাচ্চাদের কারণে তা অসম্ভব হলে ঘৃণা করতে শুরু করবে। এর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি আপনার হবে, তাহলো আপনার এই আচরণের প্রভাব ছেলেমেয়েদের মনে ব্যাপকভাবে পড়বে। ছেলেমেয়েরা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে এতটাই জটিল বা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে যে, তারা আপনার চেয়েও ভয়ঙ্কর কাজ শুরু করতে পারে। অপরাধ জগতে যারা প্রবেশ করে, তাদের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করে দেখলে এই জটিল মানসিকতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। যার মূল কারণ আপনারই রূঢ় ও ভারসাম্যহীন আচরণ। আপনার সাময়িক অসহিষ্ণুতা কতো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা একবার ভেবে দেখুন।
সর্বোপরি একটা বিষয় আপনার সুষ্ঠুভাবে চিন্তা করা উচিত, তাহলো যেই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার কারণে আপনি রূঢ় আচরণ শুরু করলেন, সেই ঘটনার জন্য আপনি, আপনার স্ত্রী কিংবা ছেলেমেয়েরা কী দায়ী? মোটেই না। ফলে আপনার নিরপরাধ পরিবারের সদস্যদের সাথে নির্দয় আচরণ করা কি অন্যায় নয়? বুদ্ধিমানের কাজ হলো সবকিছুকে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা করা। ধৈর্যহারা না হয়ে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কাজকর্ম সেরে ধীরে সুস্থে দুর্ঘটনার কথাটি আপনার স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সামনে তুলে ধরলে তারা বরং কষ্টটিকে আপনার সাথে ভাগ করে নেবে। এতে সবাই কষ্টের অংশীদার হলো। অন্যদিকে আপনাকে কতোভাবে যে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করবে, তাতে আপনার কষ্টকে আর কষ্টই মনে হবে না। আর আপনার সন্তানরা আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে। প্রতিদিন তারা অপেক্ষায় থাকবে কখন আপনি বাসায় ফিরবেন। ঠিকমতো আপনি পৌঁছলেন কিনা এ ব্যাপারে তারা সদা উদ্বিগ্ন থাকবে। যার ফলে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হবে। তাই কোন সমস্যার মোকাবেলায় উগ্রতা পরিহার করে ঠাণ্ডা মাথায় সামাধান করার চেষ্টা করুন। পরিবারের সবার সাথে বিশেষ করে স্ত্রীর সাথে হাসিখুশী থাকার চেষ্টা করুন। সুন্দর আচরণ করার চেষ্টা করুন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এটাকে ঈমানের নিদর্শন বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্দর আচরণ করে, তার ঈমান অধিকতর পূর্ণ। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ যে তার নিজ পরিবারের সাথে সুন্দর আচরণ করে। রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, সুন্দর আচরণের চেয়ে শ্রেয়তর কোন কর্ম নেই। (তিরমিযী)

কুরআনের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব

কুরআনের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব

কুরআনের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব

মাতৃভাষার সাথে মানুষের জন্মগত ও স্বভাবগত চাহিদা রয়েছে। আর এ চাহিদার অমূল্যায়ন ইসলাম কস্মিনকালেও করেনি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এবং রাষ্ট্রীয় ভাষাও বাংলা। সুতরাং বাংলা ভাষাকে অমূল্যায়ন করা বা অবহেলা করা কখনো সমীচীন হবে না।
ইসলাম মাতৃভাষাকে মর্যাদার উচ্চাসনে সমাসীন করেছে। তাইতো দেখা যায় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যুগেযুগে পথভ্রষ্ট মানব জাতিকে সুপথে পরিচালনা করার নিমিত্ত অসংখ্য নবী -রাসূলকে আসমানী কিবাতসহ তাঁদের স্ব-জাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন।
যেমন হযরত দাউদ (আ.) এর ‘যবূর’ ছিল, তাঁর সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ‘ইউনানীতে’। হযরত মূসা (আ.) এর ‘তাওরাত’ ছিল, তাঁর সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ‘ইবরানীতে’। হযরত ঈসা (আ.) এর ইনজীল ছিল, তাঁর স্ব-জাতির মাতৃভাষা সুরইয়ানীতে’ এবং আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর প্রতি অবতীর্ণ ‘কুরআন’ ছিল তাঁর স্ব-জাতির মাতৃভাষা ‘আরবীতে’। এভাবেই আল্লাহর বিধি-বিধান মানব জাতির কাছে পৌঁছানোর সহজতম পথটি অনুসৃত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ   ‘আমি সব রাসূলকেই তাঁদের স্ব-জাতির ভাষাভাষি করে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে (আমার বাণী ) সু স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারেন।’ (সূরা ইবরাহীম:৪)
এখানে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যেহেতু সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছিলেন, সেহেতু বিশ্বের প্রতিটি জাতির নিকট আল্লাহর বিধি-বিধান সঠিকরূপে পৌঁছানোর জন্য প্রত্যেক জাতির ভাষায় পৃথক পৃথক কুরআন অবতীর্ণ করা হলো না কেন? তার প্রতি উত্তরে উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন ধরনের অভিমত পেশ করেছেন। তন্মধ্যে বাংলা পাক ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত তাফসীর বিশারদ মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.) এর অভিমত পরিধাণযোগ্য। তিনি বলেন:
“বিশ্বের জাতিসমূহের মধ্যে শতশত ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এমতাবস্থায় সবাইকে হেদায়াত করার দু‘টি উপায় সম্ভবপর ছিল। প্রথমতঃ প্রত্যেক জাতির ভাষায় পৃথক-পৃথক কুরআন অবতীর্ণ হওয়া এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর শিক্ষাও তদ্রƒপ প্রত্যেক জাতির ভাষায় ভিন্ন-ভিন্ন হওয়া। আল্লাহর শক্তির সামনে এরূপ ব্যবস্থাপনা মোটেই কঠিন ছিলনা; কিন্তু সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এক রাসূল এক গ্রন্থ এবং এক শরীয়ত প্রেরণ করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে হাজারো মতবিরোধ সত্ত্বেও ধর্মীয় চারিত্রিক ও সামাজিক ঐক্য  ও সংহতি স্থাপনের যে মহান লক্ষ্য অর্জন করার উদ্দেশ্য ছিল, এমতাবস্থায় তা অর্জিত হত না। এছাড়া প্রত্যেক জাতির ও প্রত্যেক দেশের কুরআন ও হাদীস ভিন্ন-ভিন্ন ভাষায় থাকলে কুরআন পরিবর্তনের অসংখ্য পথ খুলে যেত এবং কুরআন একটি সংরক্ষিত কালাম, যা বিজাতি এবং কুরআন অবিশ্বাসীরাও মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করে। এ অলৌকিক বৈশিষ্ট্য খতম হয়ে যেত।
এছাড়া একই ধর্ম এবং একই গ্রন্থ সত্ত্বেও এর অনুসারীরা শতধাবিভক্ত হয়ে যেত এবং তাদের মধ্যে ঐক্যের কোন কেন্দ্রবিন্দুই অবশিষ্ট থাকতো না। এক আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল হওয়া সত্ত্বেও এর ব্যাখ্যা তাফসীরের বৈধ সীমার মধ্যে মত-পার্থক্য দেখা দিয়েছে। অবৈধ পন্থায় যেসব মত বিরোধ হয়েছে, সেগুলোর তো ইয়ত্তা নেই।
এ থেকেই উপরিউক্ত বক্তব্যের সত্যতা সম্যক অনুমান করা যায়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যারা কোন না কোন স্তরে কুরআনের বিধি-বিধান পালন করে, তাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য বিদ্যমান রয়েছে।
মোট কথা রাসূল (সা.) এর নবুওয়াত সমগ্র বিশ্বের জন্য ব্যাপক হওয়ার প্রেক্ষিতে প্রত্যেক জাতির ভাষায় ভিন্ন-ভিন্ন কুরআনের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ববাসীর শিক্ষা ও হেদায়াতের পন্থাকে কোন স্থূলবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিও সঠিক ও নির্ভুল মনে করতে পারে না। তাই দ্বিতীয় পন্থাটিই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অর্থাৎ রাসূলের ভাষাই কুরআনের ভাষা হবে।
নায়েবে রাসূল আলেমগণ প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক দেশে রাসূল (সা.) এর নির্দেশাবলী তাদের ভাষায় বোঝাবেন এবং প্রচার করবেন। আল্লাহ তা‘আলা এর জন্যে বিশ্বের ভাষাসমূহের মধ্য থেকে আরবী ভাষাকে নির্বাচন করেছেন। (মা‘আরেফুল কুরআন, প্রকাশনায় মদীনা মুনাওয়ারা ৭১২ পৃষ্ঠা)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মাতৃভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন: আমি কুরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি এর  আল্লাহভীরুদেরকে সুসংবাদ দেন এবং কলহ প্রিয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন। (সূরা মারইয়াম: ৯৭)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: আমি আপনার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা স্মরণ করে। (সূরা দুখান: ৫)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: আমি এ কুরআনকে আরবী ভাষায় (অবতীর্ণ) করেছি, যাতে তোমরা বুঝ। (সূরা যুখরুফ:৩)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: এ কুরআন বিশ্বজাহানের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত ফেরেশতা একে নিয়ে অবতরণ করেছে আপনার অন্তরে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হন সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (সূরা শু‘আরা: ১৯২-১৯৫)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: আমি এ কুরআনকে কোন ভিন্ন ভাষা-ভাষীর প্রতি অবতীর্ণ করতাম অতঃপর তিনি তা তাদের কাছে পাঠ করতেন, তাহলে তাদের তারা বিশ্বাস স্থাপন করতো না। (সূরা শু‘আরা: ১৯৮-১৯৯)
আর জাতিকে সুপথে পরিচালনা করতে হলে পরিচালক মণ্ডলীকে জাতির বোধগম্য ভাষায় কুরআন ও হাদীসের পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী অবশ্যই হতে হবে, নচেৎ জাতির সামনে মনের ভাব ও মূল বক্তব্য ব্যক্ত করা কখনো সম্ভব হবে না। যদি নবীদের ভাষা উম্মতের ভাষা থেকে ভিন্ন হত, তাহলে নবীদেরকে উম্মতের নিকট আল্লাহর বিধ-বিধান পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অনুবাদের ঝুঁকি গ্রহণ করতে হতো। এরপরও উম্মতের কাছে আল্লাহর বিধি-বিধান সঠিকরূপে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে থেকে যেত অসংখ্য সন্দেহ। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দেশে কোন নবী প্রেরণ করতেন, তাহলে তাঁকেও এদেশের মাতৃভাষার মাধ্যমেই প্রেরণ করতেন।
দ্বিতীয়তঃ বিশ্বের বুকে যতগুলো শিশু জন্মগ্রহণ করে, তারা বুঝ, জ্ঞান ও অনুভূতির ভাষা শিক্ষা করে, মাতা-পিতা, ভাই-বোন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এ ভাষা শিশুদের মনের দুয়ার খুলে দেয় এবং বুঝতে, শিখতে ও জানতে সাহায্য করে।
এমনিভাবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বাতেল যে যুগে যে-রূপ নিয়ে মানব সমাজে এসেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, যে যুগের নবীকেও তার মুকাবেলা করার জন্য সে ধরণের মু‘জিযা দিয়ে পাঠিয়েছেন।
হযরত নূহ (আ.)-এর যুগ ছিল জাহাজ শিল্পের উন্নতির যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে জাহাজ শিল্পের জ্ঞান দান করে ছিলেন।
হযরত দাউদ (আ.)-এর যুগ ছিল গান-বাজনা চর্চার যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন সুমধুর কণ্ঠ দান করে ছিলেন যে, তাঁর কণ্ঠে আল্লাহর কালাম শ্রবণের জন্য মানুষ ছাড়াও, আকাশের উড়ন্ত পাখি পর্যন্ত নেমে আসতো।
হযরত সুলাইমান (আ.)Ñএর যুগ ছিল রাজ ক্ষমতা এবং অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্যের যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে মানব ইতিহাসের সর্বাধিক রাজক্ষমতা এবং অর্থ-সম্পদ দান করেছিলেন। তিনি এমন রাজ-ক্ষমতা সম্পন্ন ছিলেন যে, কেবলমাত্র জিন-পরী এবং পশু-পাখি কেন? বায়ূ পর্যন্ত তাঁর আজ্ঞাধীন থাকতে বাধ্য ছিল।
হযরত মূছা (আ.)-এর যুগ ছিল যাদু বিদ্যার উৎকর্ষের যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে ‘লাঠি’ দিয়ে সাপ বানানোর ক্ষমতা দান করেছিলেন।
হযরত ঈসা (আ.)-এর যুগ চিকিৎসা বিদ্যার সোনালীর যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন রোগ নিরাময় ক্ষমতা দান করেছিলেন যে, তার হাতের স্পর্শের জন্মান্ধ ব্যক্তি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেত এবং কুষ্ঠরোগী রোগ থেকে মুক্তি পেত। এমনকি মৃত ব্যক্তিও আল্লাহর হুকুমে জীবিত হয়ে যেত।
এমনিভাবে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর যুগ ছিল সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ্যেত্বের যুগ। তাই তাঁকে দেওয়া হয়েছিল গোটা বিশ্বের অদ্বিতীয় উজ্জ্বলতম সাহিত্যগ্রন্থ আল-কুরআন। যাকে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর সর্বাপেক্ষা বড় এবং স্থায়ী মু‘জিযা বলে উল্লেখ করে, গোটা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। যেমন কুরআনুল কারীমে সমগ্র মানব গোষ্ঠীকে সম্বোধন করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন যে, যদি তোমরা কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলে স্বীকার না কর; বরং মানব রচিত  মনে কর, তাহলে তোমরাও তো মানুষ; এর মত একটি গ্রন্থ রচনা করে নিয়ে এসো। প্রয়োজনে তোমাদের সাথে জিনদেরকেও মিলিয়ে নাও।
যখন তারা কুরআনের ন্যায় গ্রন্থ রচনা করতে অপারগ হলো, তখন তাদের অপারগতাকে আরো প্রকটভাবে প্রমাণ করার জন্য পর্যায়ক্রমে বলা হয়েছে, যে তোমরা কুরআনের সূরার ন্যায় দশটি সূরা তৈরী কর। সর্বশেষে বলা হয়েছে যে, তোমরা কুরআনের সূরার ন্যায় একটি সূরা তৈরী কর। নি¤েœ এ সম্পর্কে আয়াতসমূহ উল্লেখ করা হলো।
“বল, যদি মানুষ ও জিন এ কুরআনের অনুরূপ হাজির করার জন্য একত্র হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাজির করতে পারবে না। যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।” (সূরা আল-ইসরা : ৮৮)
নাকি তারা বলে, ‘সে এটা রটনা করেছে’? বল, ‘তাহলে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে আন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। (সূরা হূদ: ১৩)
নাকি তারা বলে, ‘সে তা বানিয়েছে’? বল, ‘তবে তোমরা তার মত একটি সূরা (বানিয়ে) নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।  (সূরা ইউনুস: ৩৮)
আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সূরা বাকারা: ২৩)
অনুরূপভাবে তাদের অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমাদের প্রিয়নবী (সা.) একটি অভিনব পন্থা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কুরআনের সবচেয়ে ছোট সূরা ‘সূরায়ে কাউছারের’ একটি আয়াত إنا أعطيناك الكوثر লিখে কাবা ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখার জন্য সাহাবায়ে কেরামকে পরামর্শ দিলেন এবং তৎকালীন প্রথিত যশা কবি-সাহিত্যিক এবং জ্ঞানী-গুনীদেরকে ঐ আয়াতের বর্ণনা ভঙ্গি, ভাষাশৈলী, অনন্য রচননীতি এবং সমিল ছন্দের ন্যায় আরেকটি আয়াত রচনা করার জন্য আহ্বান জানালেন। আরবের সেরা কবি সাহিত্যিকগণ তাঁর এ ডাকে সাড়া দিয়ে শত চেষ্টা করেও ঐ আয়াতের ন্যায় একটি আয়াত রচনা করতে সমর্থ হয়নি, ফলে তারা জোটবদ্ধভাবে পরাজয় বরণের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
অবশেষে তখনকার যুগের শ্রেষ্ঠ কবি ‘লবিদ ইবনে রাবিয়াহ’ উক্ত আয়াতটি লিখে দিলেন: ليس هذا كلام البشر অর্থাৎ এটা কোন মানব রচিত গ্রন্থ নয়। সাথে সাথে ঐ ছন্দের মাধ্যমেই তাদের পরাজয় বরণের ঘোষণাটি আরো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে।
মোটকথা, কুরআনের অসাধারণ বর্ণনা ভঙ্গি, ভাষাশৈলী, অনন্য রচনানীতি এবং বিষয়বস্তুর মৌলিকত্ব ও গভীরতার কারণেই কুরআন ও কুরআনের বাহক নবী (সা.) এর বিরুদ্ধে জান-মাল এবং ইজ্জত-আবরু সবকিছু ব্যয় করার জন্য তারা প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কুরআনের এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে একটি আয়াত রচনা করতে কেউ সাহসী হয় নি।
কুরআনের এ দাবী বা চ্যালেঞ্জে সারা আরববাসী  শুধু পরাজয়বরণ করেই ক্ষান্ত হয়েছে, তা নয়; বরং একে অনন্য বা অদ্বিতীয় বলেও প্রকাশ্যভাবে স্বীকার করেছে। যেমন কথিত আছে, আরবের একজন সরদার ‘আসআদ ইবনে যেরার’ রাসূল (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.) এর নিকট স্বীকার করেছেন যে, তোমরা অনর্থক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধাচরণ করে নিজেদের ক্ষতি করছো এবং পারস্পরিক সম্পর্কচ্ছেদ করছো। আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, নিশ্চয় তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি যে কালাম পেশ করেছেন তা আল্লাহর, এতে বিন্দু মাত্রও সন্দেহ নেই। (মা‘আরেফুল কুরআন বাদশা ফাহাদ কর্তৃক প্রকাশিত ২৪ পৃষ্ঠা)
আরবের জাহেলী যুগের সাতজন শ্রেষ্ঠ কবির অন্যতম সাহাবী লবীদ (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর নি¤œলিখিত দু‘টি ছন্দ ব্যতীত অন্য কোন কবিতা আবৃত্তি করেননি। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন যে, ‘কুরআনের (অনন্য ভাষাশৈলীর) সামনে কবিতা আবৃত্তি করতে আমি লজ্জাবোধ করি।’ কবি লাবীদের ছন্দ দু‘টি নি¤েœ দেওয়া হলো:
< ألا كل شيئ ماخلا الله باطل
< و كل نعيم لا محالة زائل
< نعيمك في الدنيا غرور و حسرة
< و عيشك في الدنيا محال  و باطل
“জেনে রেখ! আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সবই অকার্যকর। সমস্ত নিয়ামত অবশ্যই ধ্বংস হবে। তোমার পার্থিব নেয়ামত ধোঁকা এবং আফসোসের সামগ্রী। আর তোমার সুখের জীবন এ পৃথিবীতে নিশ্চয় অসম্ভব ও অকার্যকর।
হযরত মূছা (আ.) যখন আল্লাহর দিদার লাভের উদ্দেশ্যে ‘তূর পাহাড়ে’ গিয়েছিলেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সাথে তাঁর ভাষাতেই কথোপকথোন করেছিলেন। এমনিভাবে আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (সা.) যখন ‘হেরা গুহায়’ আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) তাঁর ভাষাতেই তাঁর নিকট আল্লাহর বাণী নিয়ে এসেছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ ইসলাম মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছে বলেই ইসলাম যেখানেই পৌঁছেছে, সেখানকার মাতৃভাষা পরিচর্যায় প্রেরণা যুগিয়েছে। এ সত্যটিকে মর্মেমর্মে উপলদ্ধি করে আমাদেরকেও স্ব-স্ব মাতৃভাষায় দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জন করে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রচার ও প্রসারের কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
আমাদের মাতৃভাষা ‘বাংলা’। বাংলাদেশসহ পশ্চিম বঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে প্রায় ত্রিশ কোটি বাংলা ভাষা-ভাষী। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর নিকট নবীদের অনুসারী হিসেবে যুগ চাহিদার ভিত্তিতে আল্লাহর বিধি-বিধান এবং ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে উলামায়ে কেরামগণসহ বক্তাগণের মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজনীয় নয় কি?

অলী আওলিয়াদের অসীলা গ্রহণ ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ

অলী আওলিয়াদের অসীলা গ্রহণ ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ

অলী আওলিয়াদের অসীলা গ্রহণ ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ

বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি  ইসলাম সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকার কারণে বা ইসলাম সম্পর্কে উদাসীনতার কারণে ইসলাম ধর্মের নামে অনেক অনাচার, কুসংস্কৃতি, শিরক ও বিদআত প্রচলিত আছে ও প্রচলন ঘটছে। এর মধ্যে একটি হল, অলী আওলিয়াদের অসীলা দিয়ে দুআ-প্রার্থনা করা, তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া, তারা ভাল-মন্দ কিছু করতে পারে বলে বিশ্বাস রাখা, তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত লাভ করা যাবে বলে বিশ্বাস করা। এ উদ্দেশ্যে তাদের কবর যিয়ারত করা, তাদের কবর তওয়াফ করা, কবরে উরস উৎসব আয়োজন করা ইত্যাদি। অনেক মুসলিম এ সকল কাজ এ ধারনার ভিত্তিতেই করে যে, এই কবরে শায়িত অলী আওলিয়ারা আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলে আল্লাহর রহমত লাভ করা যাবে। অথবা তাদেরকে অসীলা বা মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করলে আল্লাহ আমাদের উপর সন্তুষ্ট হবেন। তাদেরকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করতে যেয়ে তারা তার মাধ্যমে বা তার নামে বিপদ থেকে মুক্তি কামনা করে আল্লাহর কাছে। অনেকে সরাসরি তাদের কাছেই নিজেদের প্রয়োজন ও অভাব পুরণের জন্য প্রার্থনা করে। বিপদ থেকে উদ্ধার কামনা করে। তারা মনে করে এ ধরণের অসীলা গ্রহণ করতে ইসলামে নিষেধ নয়। বরং এদের অনেকে মনে করে এ ধরনের অসীলা গ্রহণ ইসলামে একটি ভাল কাজ।
কিন্তু আসলে অসীলা গ্রহণ কী? এর বেধতা কতটুকু? বক্ষমান প্রবন্ধে এ বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।
সত্যিকার অসীলা হল, আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণের মাধ্যমে সৎকর্ম করা আর নিষিদ্ধ ও হারাম কথা-কর্ম থেকে বেঁচে থাকা। আর নেক আমল সম্পাদন করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা হল সত্যিকার অসীলা। তা ছাড়া আল্লাহ সুন্দর নামসমূহ ও গুণাবলির মাধ্যমে অসীলা গ্রহণের কথা আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছেন।
কিন্তু মৃত অলী আওলিয়াদের কবরের কাছে যাওয়া, কবর তওয়াফ করা, কবরে-মাজারে মানত করা, কবরে শায়িত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা, তার কাছে নিজের অভাব অভিযোগের কথা বলা ইত্যাদি কাজ-কর্মের মাধ্যমে অসীলা গ্রহণ শুধু নিষিদ্ধই নয় বরং এগুলো শিরক ও কুফরী। এগুলোতে কেহ লিপ্ত হলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। নাউজুবিল্লাহ!
এ গেল মৃত অলী আওলিয়াদের অসীলা গ্রহণ সম্পর্কে। আবার অনেকে জীবিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে নাজায়েয অসীলা গ্রহণ করে থাকে। তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে থাকে। যেমন গরু, ছাগল, মুরগী জবেহ করার সময় বলে থাকে: আমাদের পীর সাবের নামে বা আমার বাবার নামে জবেহ করলাম। অথবা নিজের পীর বা পীরের পরিবারের লোকদের সম্মানের জন্য সেজদা করে থাকে। এগুলো সবই শিরক এবং শিরকে আকবর বা বড় শিরক। অনেকে নিজের জীবিত পীর ফকীরদের সম্পর্কে ধারনা করে থাকে যে, আল্লাহ তাআলার সাথে তার বিশেষ যোগাযোগ বা সম্পর্ক আছে, তাই তার মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়া যাবে, এটাও শিরক।
যারা একদিন লাত উজ্জা প্রভৃতি দেব-দেবীর পূজা করতো, তারা কিন্তু এ বিশ্বাস করতো না যে এগুলো হল তাদের প্রভূ বা সৃষ্টিকর্তা। বরং তারা বিশ্বাস করতো এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে বা তাদেরকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করে তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে। তারা এটাও বিশ্বাস করতো না যে, এ সকল দেব-দেবী বৃষ্টি দান করে বা রিযক দান করে। তারা বলতো :
আমরা তো তাদের ইবাদত করি এ জন্য যে তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে। (সূরা যুমার, ৩) তারা এ সম্পর্কে আরো বলতো : এরা (দেব-দেবী) আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে শুপারিশ করবে। (সূরা ইউনুস: ১৮)
দেখা গেল তারা এ অসীলা গ্রহণের কারণেই শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়লো। আর এ শিরকের বিরুদ্ধে তাওহীদের দাওয়াতের জন্যই আল্লাহ তাআলা রাসূলগণকে পাঠালেন যুগে যুগে, প্রতিটি জনপদে। এ সকল দেব-দেবীর কাছে যেমন প্রার্থনামূলক দুআ করা শিরক তেমনি সাহায্য প্রার্থনা করে দুআ করাও শিরক।
আল্লাহ তাআলা বলেন: বল, তাদেরকে ডাক, আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে (উপাস্য) মনে কর। তারা তো তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার ও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না।  (সূরা ইসরা, ৫৬)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: বল, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে করতে তাদেরকে আহবান কর। তারা আসমানসমূহ ও যমীনের মধ্যে অণু পরিমাণ কোন কিছুর মালিক নয়। আর এ দুয়ের মধ্যে তাদের কোন অংশীদারিত্ব নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সাহায্যকারীও নয়। আর আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন সে ছাড়া তাঁর কাছে কোন সুপারিশ কোন কাজে আসবে না। (সূরা সাবা, ২২-২৩)
এ সকল আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বললেন: আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাকা হয়, যাদের কাছে দুআ-প্রার্থনা করা হয় তারা অনু পরিমাণ বস্তু সৃষ্টি করতে পারে না। তারা কোন সৃষ্টি জীবের সামান্য কল্যাণ করার ক্ষমতা রাখে না। তারা আশ্রয় প্রার্থনাকারীকে কোন আশ্রয় দেয়ার সামর্থ রাখে না।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরকে মসজিদ বানাতে নিষেধ করেছেন। কবরের কাছে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন। কবরকে সেজদা দিতে নিষেধ করেছেন। তিনি ওফাতের সময়ও বলেছেন: আল্লাহ তাআলা ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের অভিসম্পাত করুন। তারা নবীদের কবরকে ইবাদতের স্থান হিসাবে গ্রহণ করেছে। আর ইবাদত-বন্দেগীর দ্বারা কবরকে সম্মান করা হল শিরকে লিপ্ত হওয়ার একটি রাস্তা। এভাবে কবরকে পূজা করার মাধ্যমেই মানুষ মূর্তি পূজার দিকে ধাবিত হয়।
ওমর (রা.) দুআর সময় আব্বাস (রা.) কে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন, এ বিষয়টি দিয়ে অনেকে মৃত ব্যক্তির অসীলা গ্রহণ করার বৈধতা দেয়ার প্রয়াস পান। কিন্তু ওমর (রা.) আব্বাস (রা.) এর দুআকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করেছেন তার ব্যক্তিত্বকে নয়। আর আব্বাস (রা.) তখন জীবিত ছিলেন। যে কোন জীবিত ব্যক্তির দুআকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করা যায়। ওমর (রা.) তা-ই করেছেন। তিনি বলেছেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত থাকাকালে আমরা তার অসীলা দিয়ে দুআ করতাম। এখন তিনি নেই তাই আমরা তার চাচা আব্বাসকে দুআ করার ক্ষেত্রে অসীলা হিসাবে নিলাম। ওমর (রা.) এর এ বক্তব্যে স্পষ্ট হল যে, তিনি কোন মৃত ব্যক্তিকে দুআর সময় অসীলা হিসাবে গ্রহণ বৈধ মনে করতেন না। তিনি নবী হলেও না। বিষয়টা এমন, যেমন আমরা কোন সৎ-নেককার ব্যক্তিকে বলে থাকি, আমার জন্য দুআ করবেন। কোন আলেম বা বুযুর্গ ব্যক্তির মাধ্যমে আমরা নিজেদের জন্য দুআ করিয়ে থাকি। এটাও এক ধরণের অসীলা গ্রহণ। এটা বেধ। কিন্তু কোন বুযুর্গ ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাকে অসীলা করে দুআ করা, দুআর সময় তার রূহের প্রতি মনোনিবেশ করা (যেমন অনেকে বলে থাকে আমি আমার দাদাপীর অমুকের দিকে মুতাওয়াজ্জুহ হলাম), তার থেকে ফয়েজ-বরকত লাভের ধারনা করা, এগুলো নিষিদ্ধ ও শিরক। মৃত ব্যক্তি যত মর্যাদাবান বুযুর্গ হোক সে কারো ভাল-মন্দ করার ক্ষমতা রাখে না। যখন সে মৃত্যুর পর নিজের জন্য ভাল মন্দ কিছু করতে পারে না, তখন অন্যের জন্য কিছু করতে পারার প্রশ্নই আসে না। সে কারো দুআ কবুলের ব্যাপারে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না। কাউকে উপকার করার বা বিপদ থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা তার থাকে না।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে বলেছেন : মৃত ব্যক্তি নিজের কোন উপকার করতে পারে না। তিনি বলেছেন :
মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু তিনটি কাজের ফল সে পেতে থাকে।
১. ছদকায়ে জারিয়াহ (এমন দান যা থেকে মানুষ অব্যাহতভাবে উপকৃত হয়ে থাকে)
২. মানুষের উপকারে আসে এমন ইলম (বিদ্যা)
৩. সৎ সন্তান যে তাঁর জন্য দুআ করে।  মুসলিম,
হাদীসটির মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানা গেল মৃত ব্যক্তি জীবিত ব্যক্তিদের দুআ, ক্ষমা প্রার্থনার ফলে উপকার পেতে পারে। কিন্তু জীবিত ব্যক্তিরা মৃতদের থেকে এরূপ কিছু আশা করতে পারেনা।
যখন হাদীস থেকে প্রমাণিত হল যে, কোন আদম সন্তান যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়। তার আমল দিয়ে সে কোন উপকার লাভ করতে পারে না, তখন আমরা কিভাবে বিশ্বাস করি যে, অমুক ব্যক্তি কবরে জীবিত আছেন? তার সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়? তিনি আমাদের উপকার করতে পারেন? আমাদের প্রার্থনা শুনেন ও আল্লাহর কাছে শুপারিশ করেন? এগুলো সব অসার বিশ্বাস। এগুলো যে শিরক তাতে কোন সন্দেহ নেই।
মৃত ব্যক্তিরা যে কবরে শুনতে পায় না, কেহ তাদেরকে কিছু শুনাতে পারে না এটা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আল কুরআনে ইরশাদ করেছেন। তিনি নবীকে সম্বোধন করে বলেছেন: নিশ্চয় তুমি মৃতকে শোনাতে পারবে না, আর তুমি বধিরকে আহবান শোনাতে পারবে না। (সূরা নামল, ৮০)
যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন মৃতকে কিছু শোনাতে পারেন না, তখন সাধারণ মানুষ কিভাবে এ অসাধ্য সাধন করতে পারে? কাজেই আমরা মৃতদের কবরে যেয়ে যা কিছু বলি, যা কিছু প্রার্থনা করি তা তারা কিছুই শুনতে পায় না। যখন তারা শুনতেই পায় না, তখন তারা প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কিভাবে কবুল করবে? কিভাবে তাদের হাজত-আকাঙ্খা পূরণ করবে? আল্লাহ তাআলা ব্যতীত যা কিছুর উপাসনা করা হয়, তা সবই বাতিল। আল্লাহ তাআলা বলেন: আর আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকার করতে পারে না এবং তোমার ক্ষতিও করতে পারে না। অতএব তুমি যদি কর, তাহলে নিশ্চয় তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন ক্ষতি পৌঁছান, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহের কোন প্রতিরোধকারী নেই। তিনি তার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দেন। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু (সূরা ইউনূস, ১০৬-১০৭)
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা গেল আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাকা হয়, যাদের কাছে দুআ-প্রার্থনা করা হয় তা সবই বাতিল। আরো স্পষ্ট হল যে, এগুলো কাউকে উপকার করতে পারে না বা ক্ষতি করতে পারে না।
যখন তারা সবই বাতিল, তাদের কাছে দুআ-প্রার্থনা করলে যখন কোন উপকার হয় না তখন কেন তাদের স্মরণাপন্ন হবে? কেন তাদেরকে অসীলা গ্রহণ করা হবে? কেন তাদের কবরে যেয়ে দুআ করা হবে?

অনেক বিভ্রান্ত লোককে বলতে শুনা যায়, অমুক অলীর মাজার যিয়ারত করতে গিয়েছিলাম। সেখানে যেয়ে এই দুআ করেছিলাম। দুআ কবুল হয়েছে, যা চেয়েছিলাম তা পেয়ে গেছি ইত্যাদি। এ ধরনের কথা-বার্তা আল্লাহ তাআলার প্রতি মিথ্যারোপের শামিল।
হ্যাঁ, হতে পারে অলী আওলিয়াদের মাজারে গিয়ে কিছু চাইলে তা যে অর্জন হবে না এ কথা বলা যায় না। তবে অর্জন হলে সেটা দু‘ কারণে হতে পারে:
এক. অলীর মাজারে যেয়ে যা চাওয়া হয়েছে তা পুরণ করা কোন সৃষ্টজীবের পক্ষে সম্ভব হবে অথবা হবে না। যদি সম্ভব হয়, তাহলে হতে পারে শয়তান প্রার্থীত বিষয়গুলোকে অর্জন করিয়ে দিয়েছে। যাতে শিরকের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি হয়। যা চেয়েছে শয়তান সেগুলো তাকে দিয়েছে। কেননা যে সকল স্থানে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্যের ইবাদত করা হয় সে সকল স্থানে শয়তান বিচরণ করে। যখন শয়তান দেখল কোন ব্যক্তি কবর পূজা করছে, তখন সে তাকে সাহায্য করে থাকে। যেমন সে সাহায্য করে মূর্তিপূজারীদের। সে তাদের এ সকল শিরকি কাজগুলোকে তাদের কাছে সুশোভিত করে উপস্থাপন করে থাকে বলে আল্লাহ তাআলা আল কুরআনে বহু স্থানে উল্লেখ করেছেন।
এমনিভাবে শয়তান গণক ও জ্যোতিষীদের সাহায্য করে থাকে তাদের কাজ-কর্মে। তাই অনেক সময় এ সকল গণকদের কথা ও ভবিষ্যতবাণী সত্যে পরিণত হতে দেখা যায়।
এমনিভাবে শয়তান মানুষের আকৃতি ধারণ করে বিপদগ্রস্ত মানুষকে বলে থাকে অমুক মাজারে যাও, তাহলে কাজ হবে। পরে সে যখন মাজারে যায় তখন শয়তান মানুষের রূপ ধারণ করে তার সাহায্যে এগিয়ে আসে। ফলে বিপদে পড়া মানুষটি মনে করে মাজারে শায়িত অলী তাকে সাহায্য করেছে। এমনিভাবে শয়তান মানব সমাজে শিরকের প্রচলন ঘটিয়েছে ও শিরকের প্রসার করে যাচ্ছে।
দুই. আর যদি প্রার্থীত বিষয়টি এমন হয় যা পূরণ করা শুধু আল্লাহ তাআলার পক্ষেই সম্ভব, তাহলে বুঝতে হবে এ বিষয়টি অর্জনের কথা তাকদীরে আগেই লেখা ছিল। কবরে শায়িত ব্যক্তির বরকতে এটির অর্জন হয়নি।
তাই সকল বিবেক সম্পন্ন মানুষকে বুঝতে হবে যে মাজারে যেয়ে দুআ করলে কবুল হয় বলে বিশ্বাস করা সর্বাবস্থায়ই কুসংস্কার।  কেউ যদি মাজারে যেয়ে দুআ প্রার্থনা করে, মাজার পূজা করে মানুষ থেকে ফেরেশতাতে পরিণত হয় তাহলেও বিশ্বাস করা যাবে না যে, এটা মাজারে শায়িত অলীর কারণে হয়েছে। এর নামই হল ঈমান। এর নামই হল নির্ভেজাল তাওহীদ। তাওহীদের বিশ্বাস যদি শিরকমিশ্রিত হয়, কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয় তা হলে ঐ ব্যক্তির মুক্তি নেই।
কাল্পনিক কারামত
অনেক মানুষই মুজিযা আর কারামতের পার্থক্য জানে না। মুজিযা আর কারামত কি তা বুঝে না। মুজিযা হল এমন অলৌকিক বিষয় যা নবীদের থেকে প্রকাশ পায়। আর কারামত হল এমন অলৌকিক বিষয় যা আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাদের থেকে প্রকাশ পায়। মুজিযা প্রকাশের শর্ত হল নবী বা রাসূল হওয়া। আর কারামত প্রকাশের শর্ত হল নেককার ও মুত্তাকী হওয়া। অতএব যদি কোন বিদআতী পীর-ফকির বা শিরকে লিপ্ত ব্যক্তিদের থেকে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পায় সেটা মুজিযাও নয়, কারামতও নয়। সেটা হল শয়তানের দাজ্জালী ধোঁকা-বাজি বা প্রতারণা।
অনেক অজ্ঞ লোক ধারনা করে থাকে মুজিযা বা কারামত, সাধনা বা চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে অর্জন করা যায়। বা মানুষ ইচ্ছা করলেই তা করতে পারে। তাই এ সকল অজ্ঞ লোকেরা ধারনা করে অলী আউলিয়াগণ ইচ্ছা করলে কারামতের মাধ্যমে অনেক কিছু ঘটাতে পারেন, বিপদ থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে পারেন। কিন্তু আসল ব্যাপার হল, কারামত কোন ব্যক্তির ইচ্ছাধীন নয়। এটি একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাধীন। মানুষ ইচ্ছা করলে কখনো কারামত সংঘটিত করতে পারে না, সে যত বড় অলী বা পীর হোক না কেন।
কোন বিবেকমান মানুষ বিশ্বাস করে না যে, একজন মানুষের প্রাণ চলে যাওয়ার পর তার কিছু করার ক্ষমতা থাকে। আবার যদি সে কবরে চলে যায় তাহলে কিভাবে সে কিছু করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে?
এ ধরনের কথা তারাই বিশ্বাস করতে পারে অজ্ঞতার ক্ষেত্রে যাদের কোন নজীর নেই। অলী তো দূরের কথা  কোন নবীর কবরও পূজা করা জায়েয নেই। নবীর কবরতো পরের কথা, জীবিত থাকা কালে কোন নবীর ইবাদত করা, বা তাকে দেবতা জ্ঞান করে পূজা করাও যায় না। এটা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: কোন মানুষের জন্য সঙ্গত নয় যে, আল্লাহ তাকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করার পর সে মানুষকে বলবে, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে আমার ইবাদতকারী হয়ে যাও। বরং সে বলবে, তোমরা রব্বানী (আল্লাহ ভক্ত) হও। যেহেতু তোমরা কিতাব শিক্ষা দিতে এবং তা অধ্যয়ন করতে। আর তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ করেন না যে, তোমরা ফেরেশ্তা ও নবীদেরকে প্রভূ রূপে গ্রহণ কর। তোমরা মুসলিম হওয়ার পর তিনি কি তোমাদেরকে কুফরীর নির্দেশ  দেবেন? (সূরা আলে ইমরান: ৭৯-৮০)
মুশরিকদের অবস্থা : অতীত ও বর্তমান
যারা কবর মাযার পূজা করে তারা বলে থাকে যে, মুশরিকরা মূর্তি পূজা করত। আমরাতো মূর্তি পূজা করি না। আমরা আমাদের পীর দরবেশদের মাজার জিয়ারত করি। এগুলোর ইবাদত বা পূজা করি না। তাদের অসীলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ-প্রার্থনা করি যেন আল্লাহ তাদের সম্মানের দিকে তাকিয়ে আমাদের দুআ-প্রার্থনা কবুল করেন। এটাতো কোন ইবাদত নয়। এদের উদ্দেশ্যে আমরা বলব, মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য ও বরকত কামনা করা সত্যিকারার্থে তার কাছে দুআ করার শামিল। যেমন ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে পৌত্তলিকরা মূর্তির কাছে দুআ-প্রার্থনা করত। তাই জাহেলী যুগের মূর্তি পূজা আর বর্তমান যুগের কবর পূজার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এ দুটো কাজই লক্ষ্য উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে এক ও অভিন্ন। যখন জাহেলী যুগের মুশরিকদের বলা হল তোমরা কেন মূর্তিগুলোর ইবাদত করো? তারাতো কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। তখন তারা ইবাদতের বিষয়টি অস্বীকার করত এবং বলত: আমরা তো তাদের ইবাদত করি না, তবে এ জন্য যে তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে। (সূরা যুমার,  ৩)
এমনিভাবে আমাদের সমাজের কবরপূজারীরাও বলে থাকে যে, আমরা তো কবরে শায়িত অলীর ইবাদত করি না। তার কাছে দুআ করি না। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু এই যে, তারা আল্লাহর কাছে প্রিয়। তাদের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ অর্জন করা যাবে। এ সকল অলীগণকে আমরা আমাদের ও আল্লাহ তা‘আলার মধ্যে, মাধ্যম মনে করে থাকি।
কাজেই পরিণতির দিক দিয়ে জাহেলী যুগের মুশরিকদের মূর্তি পূজা আর বর্তমান যুগের মুসলমানদের কবর পূজা এক ও অভিন্ন। দুটো একই ধরনের শিরক।
মুহাব্বাত ভালোবাসার ক্ষেত্রে শিরক
অন্তরের একাগ্র ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আল্লাহ ব্যতীত আর কোন সৃষ্টি পেতে পারে না। এই নির্ভেজাল শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসা হল একটি ইবাদত। যারা মনে করে আমরা এই কবরের অলী ও বুযুর্গদের অত্যাধিক ভালোবাসি, তাদের শ্রদ্ধা করি, তাদের সম্মান করি তাহলে এটিও একটি শিরক। আর এই মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কারণেই তারা অলী-বুযুর্গদের কবরে মানত করে, কবর প্রদক্ষিণ করে, কবর সজ্জিত করে, কবরে ওরস অনুষ্ঠান করে। কবরবাসীর কাছে তারা সাহায্য চায়, উদ্ধার কামনা করে। যদি কবরওয়ালার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সম্মান ও ভালোবাসা না থাকতো, তাহলে তারা এগুলোর কিছুই করত না। আর এ ধরনের ভালোবাসা শুধু আল্লাহর তা‘আলার জন্যই নিবেদন করতে হয়। আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য নিবেদন করা শিরক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহকে ভালবাসার মত তাদেরকে ভালবাসে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালবাসায় দৃঢ়তর। (সূরা আল বাকারা, ১৬৫)
দৃঢ়তর, সত্যিকার ও সার্বক্ষণিক ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার প্রাপ্য। এটা অন্যকে নিবেদন করলে শিরক হয়ে যাবে। মুশরিক পৌত্তলিকরা তাদের দেব-দেবীর জন্য এ রকম ভালোবাসা পোষণ করে থাকে।
আল্লাহ মানুষের খুবই কাছে। মানুষ আল্লাহর কাছে তার প্রার্থনা পৌঁছে দিতে মাধ্যম বা অসীলা খোঁজে। কিন্তু কেন? আল্লাহ তাআলা কি মানুষ থেকে অনেক দূরে? আর মাজারে শায়িত সে সকল পীর অলীগণ মানুষের কাছে কি আল্লাহর চেয়েও নিকটে? কখনো নয়। একজন মানুষ যখন প্রার্থনা করে তখন সকলের আগেই তারা সরাসরি আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। আল কুরআনে আল্লাহ তাআলা নিজে বলেছেন: আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি প্রার্থনাকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। (সূরা বাকারা, ১৮৬)
মানুষ সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার কাছে তার সকল প্রার্থনা নিবেদন করবে কোন মাধ্যম ব্যতীত। এটাই ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্য ও মহান শিক্ষা। আল্লাহ তা‘আলার কাছে দুআ-প্রার্থনায় কোন মাধ্যম গ্রহণ করার মোটেও দরকার নেই।
দুআ-প্রার্থনায় আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য সৎকর্মসমূহকে অসীলা হিসাবে নেয়া যায়। তেমনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নামসমূহ অসীলা হিসাবে নেয়ার জন্য আল-কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:  আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামের মাধ্যমে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামে   বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত অচিরেই তাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। (সূরা আল আরাফ,  ১৮০)
পরিশেষে বলতে চাই, যারা এ ধরনের অন্যায় অসীলা গ্রহণের মাধ্যমে শিরকে লিপ্ত হচ্ছেন তারা এ থেকে তাওহীদের পথে ফিরে আসুন। আমাদের দায়িত্ব কেবল সত্য বিষয়টি আপনাদের কাছে পৌঁছে দেয়া। এ সকল অসীলা নিঃসন্দেহে শিরক। আর শিরক এমন এক মহা-পাপ যা আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না। যে এ শিরকে লিপ্ত হবে জাহান্নামই হবে তার ঠিকানা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা মায়েদা, ৭২)
তাই আমাদের জন্য একান্ত কর্তব্য হল, আমাদের সকল ইবাদত-বন্দেগী, দুআ-প্রার্থনা নির্ভেজালভাবে একমাত্র এক আল্লাহর তা‘আলার জন্য নিবেদন করা। তিনি যা করতে বলেছেন আমরা তাই করবো। নিজেরা কিছু উদ্ভাবন করবো না।  যদি আমরা এভাবে চলতে পারি তবে দুনিয়াতে কল্যাণ আর আখেরাতে চিরন্তন সুখ ও সফলতা লাভ করতে পারবো। অন্যথা, উভয় জগতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবো। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে শিরক থেকে হেফাজত করুন। আ-মীন

বানাতুন্নবী বা নবীদুলালী হযরত যয়নব (রা.) বিনতে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)

হযরত যয়নব বিনতে রাসূলুল্লাহ

হযরত যয়নব বিনতে রাসূলুল্লাহ

পূর্বে প্রকামিতের পর

সব কয়েদীকেই যেহেতু ফিদিয়া নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, আবুল আছ নবীজীর জামাতা বলে তাকে ফিদিয়া ছাড়াই ছেড়ে দেয়া হবে এটা তো শানে নবুওয়াতের বিরোধী। এটা কি করে হতে পারে? তাই আবুল আছ এর ফিদিয়া এই সাব্যস্ত হয় যে, তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে স্ত্রী যয়নবকে মদীনায় প্রেরণ করবেন। হযরত যয়নবকে মদীনায় নিয়ে আসার জন্য আবুল আছ এর সাথে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসাকেও দেয়া হয়। তাকে বলে দেয়া হয় যে, তুমি বতনে এয়াজিজ-এ অপেক্ষা করবে। হযরত যয়নব সেখানে পৌঁছলে তাকে নিয়ে মদীনায় আসবে। আবুল আছ মক্কায় ফিরে যয়নবকে তার ছোট ভাই কেনানার সাথে যাওয়ার অনুমতি দেন।
হযরত যয়নব যখন সফরের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন হিন্দ ইবনে ওতবা তার কাছে এসে বললেন, হে নবী দুলালী! তুমি কি পিতার কাছে যাচ্ছ? তিনি বললেন, আপাততঃ তো তেমন ইচ্ছে নেই, ভবিষ্যতে আল্লাহর মর্জী হলে দেখা যাবে। হিন্দ বললেন, বোন আমার কাছে গোপন করার কি প্রয়োজন? তুমি সত্যিই যদি যেতে চাও এবং পথের সম্বলের কিছু প্রয়োজন থাকে তাহলে বিনা দ্বিধায় বলতে পার, আমি খেদমতের জন্য প্রস্তুত। তখনো নারী সমাজের মধ্যে শত্রুতার বিষ-বাষ্প ছড়ায়নি, যা  পুরুষদের মধ্যে ছড়িয়েছিল। এ জন্য হযরত যয়নব বলেন যে, হিন্দ যা কিছু বলেছিলেন, সরল মনেই বলেছিলেন। অর্থাৎ আমার কোন জিনিসের প্রয়োজন হলে তিনি অবশ্যই পুরো করতেন।
মোট কথা, সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে দেবর কেনানা ইবনে রাবী‘কে সঙ্গে নিয়ে উটের পিঠে আরোহণ করে তিনি মদীনা শরীফ রওয়ানা হন। তখন চারিদিকে ছিল কাফের। তারা পেছনে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কাও ছিল। তাই কেনানা তীর-ধনুক ইত্যাদিও সাথে নেন। তারা রওয়ানা হলে কাফের মহলে হৈ-চৈ পড়ে যায়। কোরাইশের লোকজন তাদেরকে পাকড়াও করার কথাও চিন্তা করতে লাগলো। তাদের সন্ধানে এক দল লোক বেরিয়ে পড়ে।
তারা যি-তুয়া নামক স্থানে এদেরকে ঘেরাও করে ফেলে। ঘেরাওকারীদের দলে হাব্বার ইবনে আসওয়াদ এবং অপর এক ব্যক্তিও ছিল। হাব্বার ইবনে আসওয়াদ ছিলেন হযরত খাদীজার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। ইনি সর্ম্পকে হযরত যয়নবেরও ভাই হন। তার এ অন্যায় আচরণের জন্য মক্কা বিজয়ের দিন নবীজী তাকে হত্যার অনুমতি দেন। কিন্তু তিনি অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। এদের একজন হযরত যয়নবের প্রতি বল্লম দিয়ে হামলা চালায়। তিনি উঠের পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যান। তখন তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা ফলে তার গর্ভপাত হয়ে যায়। তিনি ভীষণ আঘাত পান। এরপর কেনানা তীর বের করে বলেন, এখন যে কেউ আমার কাছে আসবে, কবর হবে তার ঠিকানা। তার এ ঘোষণার পর সকলে এদিক সেদিক চলে যায়। কোরাইশ সরর্দাদের সাথে আবূ সুফিয়ান সামনে অগ্রসর হয়ে বলে, তুমি ক্ষণিকের জন্য তীর বন্ধ কর। আমরা তোমার সাথে একটু কথা বলে নেই। কেনানা তীর কোশবন্ধ করে জিজ্ঞেস করেন, কি বলতে চাও, বল। আবূ সুফিয়ান বললেন, মুহাম্মদ (সা.) এর হাতে আমাদেরকে যে বিপদ-মুছিবত, পরাজয় এবং লাঞ্ছনা- অবমাননার গ্লানী সইতে হচ্ছে, সে সর্ম্পকে তোমরা বেখবর নও। এখন তোমরা যদি প্রকাশ্যে তার কন্যাকে আমাদের সম্মুখ দিয়ে  নিয়ে নিয়ে যাও, তাহলে মানুষ এটাকে আমাদের দুর্বলতা, কাপুরুষতা বলে অভিহিত করবে এবং এটাকে আমাদের পশ্চাদপসারণের পূর্বাভাষ বলে মনে করবে। তোমরা নিজেরাইতো এটা বুঝতে পার যে, মুহাম্মদ (সা.) এর কন্যাকে বাধা দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই আমাদের। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে এখন তোমরা ফিরে যাও। হৈ-চৈ থেমে গেলে মানুষ যখন বুঝতে পারবে যে, আমরা মুহাম্মদের (সা.) কন্যাকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি, তখন তোমরা গোপনে তাকে নিয়ে যাবে। কেনানা এটা মেনে নিয়ে ফেরত আসেন। ঘটনাটি সাধারণ্যে প্রচারিত হলে একদিন গোপনে তাকে নিয়ে রওয়ানা হন। তিনি ‘বতনে ইয়াজিজ‘-এ যায়েদ ইবনে হারেসার কাছে পৌছে দিয়ে ফিরে যান। তিনি হযরত যয়নবকে নিয়ে মদীনা মুনাওয়ারা রওয়ানা হন।
আবূল আছও যয়নবকে অত্যাধিক ভালোবাসতেন। তাদের মধ্যে সুসর্ম্পক বিরাজ ছিলো। তাই হযরত যয়নব চলে গেলে আবূল আছ অত্যন্ত দুঃখ পান। একবার সিরিয়া সফরকালে হযরত যয়নবের কথা মনে পড়লে তিনি দুটি কবিতা আবৃত্তি করেন। কবিতা দৃ‘টি হলো
ذكرت زينب لما دركت ادما *
فقلت سقيا تشخص يسكن الحرما
بنت الأمين جزاها الله صالحة *
وكل بعل يشني ما الذى علما
অর্থ: আমি যখন আরম স্থান অতিক্রম করি, তখন যয়নবকে স্বরণ হয়।
তখন আমি বললাম, সে হেরেম শরীফে বসবাস করছে, আল্লাহ্ তাকে সজীব্ রাখুন।
আল-আমীনের কণ্যাকে আল্লাহ্ শুভ প্রতিদান দিন।
প্রত্যেক স্বামী যা ভালো জানে, তারই প্রশংসা করে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের অভিজ্ঞতা এবং আমানতদারীর জন্য আবূল আছ খ্যাত ছিলেন। কোরাইশরা তাদের পণ্য বিক্রয়ের জন্য আছ এর নিকট প্রেরণ করতো। হিজরী ৬ সালের জমাদিউল আউয়াল  মাসে আবূল আছ কোরাইশদের একটি কাফেলার সাথে শাম দেশ অভিমূখে রওয়ানা হন। সেখান থেকে ফেরার পথে নবীজী জানতে পারেন। তিনি ১৭০ জন ঘোড়া সওয়ারসহ যায়েদ ইবনে হারেসাকে প্রেরণ করেন পশ্চাদগমনের জন্যে। ঈশ নামক স্থানে উভয় কাফেলা মুখোমুখি হয়। নবীজীর প্রেরিত বাহিনী মুশরিক বাহিনীকে গ্রেফতার করে এবং তাদের পণ্যসামগ্রী হস্তগত করে। কিন্তু আবূল আছ এর কোন ক্ষতি করা হয়নি।
আবূল আছ কাফেলার এ পরিণতি দেখে তখনই মদীনা মুনাওয়ারা চলে যান এবং সেখানে পৌঁছে হযরত যয়নবের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেন। হযরত যয়নব তাকে আশ্রয় দেন। নবীজী তখন ফজরের নামাযে ছিলেন। হযরত যয়নব বুলুন্দ আওয়াযে বলেন, আমি আবূল আছকে আমার আশ্রয়ে নিয়েছি।
নবীজী নামায শেষ করে বললেন, লোক সকল! তোমরা কিছু শুনলে? সকলে আরয করেন, জি হ্যাঁ, শুনেছি। তিনি বললেন, ইতোপূর্বে এ ঘটনা সম্পর্কে আমার কিছু জানা ছিল না। কি বিস্ময়ের ব্যাপার! মুসলমানদের দুর্বল লোকেরা দুশমনদেরকে আশ্রয় দেয়।
নবীজী ঘরে তাশরীফ আনলে হযরত যয়নব তাঁর খেদমতে হাযির হলেন। তিনি আরয করলেন, আবুল আছ এর আটককৃত পণ্য ফেরত দেয়া হোক। তিনি অভিযাত্রী দলের কাছে খবর পাঠালেন, আবূল আছ এর সাথে আমার কি সর্ম্পক, তোমরা তা জানো। তোমরা তার প্রতি দয়া করে তার মলামাল ফেরত দিলে তা আমার খুশির কারণ হবে। অন্যথায় তোমাদের ইখতিয়ার রয়েছে। তারা সবাই বললো, আমরা সব কিছু ফেরত দিতে প্রস্তুত। তাই হয়েছে। তার সব কিছুই ফেরত দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে কন্যা যয়নবকে বললেন, আবূল আছ এর আদর-যতœ, সম¥ান-মর্যাদায় ত্রুটি করবে না। কিন্তু যতক্ষণ সে মুশরিক থাকে, তার নৈকট্য থেকে দূরে     থাকবে। কারণ, ইসলাম ও কুফর একত্র হতে পারে না।
বাহ্যত এ বর্ণনা দ্বারা প্রথম বর্ণনা অর্থ্যাৎ সর্ম্পক ছিন্ন না করার প্রতিবাদ হয়। কিন্তু আসলে যেহেতু এখন ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে, অতি সহজেই দুশমনদের মোকাবিলা করা যায়। তাই এমন নির্দেশ না দেয়ার কোন কারণ থাকে না নবীজীর জন্য। যেহেতু আগের সময়টি ছিল সত্যিকার অর্থেই নাযুক। তাই তখন বিবাহ বিচ্ছেদের নির্দেশ দেয়া হয়নি।
এরপর আবূল আছ তার পণ্যসম্ভার নিয়ে মক্কা মুয়ায্যমা রওয়ানা হন।  মক্কা পৌঁছে সকলের দেনা-পাওনা পরিশোধ করেন। একদিন তিনি কোরাইশকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এখন আমার কাছে কারো কোন দাবি তো অবিশিষ্ট নেই? তারা বললো; না, এখন তোমার কাছে আমাদের কোন দাবি নেই। আল্লাহ্ তোমাকে নেক প্রতিদান দিন। তুমি একজন ওফাদার এবং ভদ্র ব্যক্তি। আবূল আছ বললেন, তোমরা শুনে রেখো, এখন আমি ইসলাম গ্রহণ করছি। এই বলে তিনি পাঠ করলেন,
أشهد أن لاإله إلا الله   وحده لا شريك له وأشهد أن محمدا عبده و رسوله
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তার কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। (চলবে)

মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এক বিষ্ময়কর গ্রন্থ

মহাগ্রন্থ আল কুরআন মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার পক্ষ থেকে সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সুবিশাল জ্ঞানভাণ্ডার এবং আল্লাহ তায়ালার এক সুপরিকল্পিত নির্দেশনার বিন্যাস। কুরআন নাজিলের হাজার হাজার বছর আগের ও পরের এমন সব তথ্য এতে লিপিবদ্ধ আছে, যা বর্তমান সময়ে এটিই প্রমাণ দেয় : এই কুরআন সেই মহান সত্তার সৃষ্টি যিনি অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল এবং এই মহান সত্তা তাই সব সৃষ্টির ¯্রষ্টা হওয়া যুক্তিযুক্ত। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু আবিষ্কার করেছেন যা দেড় হাজার বছর আগের নাজিলকৃত কুরআনে আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন। আর কুরআনে কিছু জিনিস এমনভাবে এসেছে যে, তা মুসলিম অমুসলিম উভয়কে কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণার দ্বার খুলে দিয়ে বলে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ ব্যতীত কোনো মুক্তি নেই।  এমন কিছু নিদর্শনের কথাই বলব। ১৯৭৩ সালে সিরিয়ার ‘এরলুস’ নামক একটি পুরনো শহরে খননকাজের সময় কিছু পুরনো লিখন পাওয়া যায়। পুরনো লিখন থেকে চার হাজার বছর আগের ‘ইরাম’ নামক এক শহরের উল্লেখ আছে। কোনো এক সময় এরলুস অঞ্চলের লোকজন ‘ইরাম’ গোত্রের লোকদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করত। কিন্তু ইরাম শহরের নাম কোনো সাম্রাজ্যের ইতিহাসে পাওয়া যায়নি। তা আছে পবিত্র কুরআন মজিদের ‘সূরা আল ফজর’-এর সাত নম্বর আয়াতে। এ সত্যটা আবিষ্কৃত হলো বিংশ শতাব্দীতে অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে। প্রশ্ন দেড় হাজার বছর আগের কুরআনে তা এলো কী করে? এটি এই প্রমাণ করে যে, কুরআন মজিদ আল্লাহর তায়ালার বাণী। ‘সাবয়া সামওয়াত’ কথাটার অর্থ হলো ‘সাত আসমান’ আশ্চর্যের বিষয় হলো, ‘সাত আসমান কথাটি কুরআনে সাতবারই এসেছে। ‘শাহরুন’ মানে মাস। কুরআনে এ শব্দটি এসেছে ১২ বার। অবাক করার মতো বিষয় যে, এক বছরে ১২ মাস। চান্দ্র বছরের হিসাবানুযায়ী গড়ে বছরের প্রতি মাসে ৩০ দিন। বিস্ময়কর বিষয় যে, চাঁদের আরবি প্রতিশব্দ ‘কামার’ কুরআনে এসেছে ৩০ বার, যা মহান আল্লাহর বিজ্ঞতার পরিচয় দেয়। পৃথিবীর সর্বনিম্ন স্থান কোনটি? সেই স্থানটি সিরিযা, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের পতিত ‘ডেড সি’ এলাকা। মাত্র কিছু দিন আগে এক ভূ-জরিপ অনুযায়ী এটি প্রমাণিত হয়েছে। যা ‘সি লেবেলের’ ৩৯৫ মিটার নিচে। পবিত্র কুরআনের সূরা আর রোমের তিন নম্বর আয়াতে ‘ফি আদনাল আরদ’ দ্বারা আল্লাহ গোটা ভূমণ্ডলের ‘সর্বনিম্ন অঞ্চল’ বলতে ডেড সিকে নির্দেশ করেছেন দেড় হাজার বছর আগে। আল্লাহ যে সর্বজ্ঞানী এটি তারই প্রমাণ। কুরআনে ‘ইনসান’ শব্দটি এসেছে ৬৫ বার। এবার ইনসান বানাবার উপকরণগুলো কুরআনের বিভিন্ন জায়গা থেকে মিলিয়ে দেখা যাক। ‘নুতফা’ (জীবনকণা) এসেছে ১২ বার, লাহম (গোশত) এসেছে ১২ বার, এজাম (হাড়) এসেছে ১৫ বার, ‘তোরাব’ (মাটি) এসেছে ১৭ বার, ‘আলাক’ (রক্তপিণ্ড) এসেছে ৬ বার এবং ‘মুদগা’ (মাংসপিণ্ড) এসেছে ৩ বার। এসব উপাদান যোগ করলে হয় ৬৫ এবং এসব উপাদান দিয়ে বানানো ‘ইনসান’ কুরআনে ৬৫ বার উল্লেখ আছে। এটি মহান আল্লাহর জ্ঞানের ও পরিকল্পনার সূক্ষ¥তারই প্রমাণ। সূরা আল হাদিদের ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা লোহা সম্পর্কে বলেছেন ‘আমি লৌহ অবতীর্ণ করেছি যাতে রয়েছে প্রচুর শক্তি এবং মানুষের জন্য অনেক কল্যাণ।’ অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন লোহা নাজিল বা অবতীর্ণ করেছেন। এই সত্যটা আবিষ্কৃত হয়েছে এই বিংশ শতাব্দীতে। বিজ্ঞানীরা অবগত হয়েছেন যে, লোহা উৎপন্নের জন্য ১৫ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন, যা পৃথিবীতে পাওয়া অসম্ভব। এই তাপমাত্রা শুধু সূর্যেই পাওয়া সম্ভব। লোহার এই নিদর্শন আমাদের এই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নিশ্চয়ই এই মহাবিশ্বের একজন সৃষ্টিকর্তা থাকাটা যুক্তিযুক্ত এবং তিনি উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। সর্বশেষে বলতে চাই, মহাগ্রন্থ আল কুরআন শুধু পথনির্দেশিকা সংবলিত কোনো গুরুগম্ভীর পুস্তিকা নয়। এ মহাগ্রন্থ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা আমাদের সামনে এক বিস্ময়কর। কিন্তু নিখুঁত সামঞ্জস্য তুলে ধরতে সক্ষম, যা মহাবিশ্বে পৃথিবীর মধ্যকার মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টি এবং মানুষের পারস্পরিক অবস্থানে বিদ্যমান। আর যা অবশ্যই আমাদের সন্দেহপূর্ণ, এলোমেলো এবং পরকালীন চিন্তাবিহীন জীবনপদ্ধতিতে মহান রাব্বুল আলামিন সম্বন্ধে দৃঢ় বিশ্বাস এনে দেবে।

কুরআনের ভালোবাসায় রুশ নারীর ইসলাম গ্রহণ এবং রুশ ভাষায় কুরআনের ভাষান্তর

কুরআনের ভালোবাসায় রুশ নারীর ইসলাম গ্রহণ এবং রুশ ভাষায় কুরআনের ভাষান্তর

কুরআনের ভালোবাসায় রুশ নারীর ইসলাম গ্রহণ এবং রুশ ভাষায় কুরআনের ভাষান্তর

বিশ বছরের অধিককাল আগে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বর্তমানে তাঁর করা কুরআনের অর্থানুবাদকে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ হিসেবে গণ্য করছেন। তিনিই এগিয়ে এসেছেন রাশিয়ায় কুরআনুল কারীমের ক্ষেত্রে অনেক গবেষণাকারী ও বিজ্ঞজনদের মৃত্যুজনিত অভাব পূরণে।
তিনি হলেন রাশিয়ান নারী ভেলেরিয়া বোরোচভা (Valeria Borochva)। নিজের কুরআন অনুবাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত আমাকে তার প্রেমিক বানিয়েছে আর এ ভালোবাসাই আমাকে তা রুশ ভাষায় অনুবাদে অনুপ্রাণিত করেছে।’
ভেলেরিয়া বোরোচভা কিন্তু কোনো আলেমা বা ইসলাম বিশেষজ্ঞ  নন। ইসলামের আইনশাস্ত্র বা ফিকহ বিষয়েও তিনি কোনো ডিগ্রিধারী নন। হ্যা, তাঁর বিশেষত্ব হলো তিনি রাশিয়ান ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ সমাপ্ত করেছেন। সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার ৬০ মিলিয়ন মুসলিমের জন্য যা এক গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি হিসেবে বরিত ও প্রশংসিত হচ্ছে।
আল-আরাবিয়া ডট নেটকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর রুশ ভাষায় মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অনুবাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী সিরিয়ার দামেস্ক শহরে বসবাসকারী এক আরব। তাঁর সঙ্গে আমি ১০ বছর কাটাই দামেস্কে। ইতোপূর্বে আমি আরবী জানতাম না। সেখানেই আরবী শিখি। আরবী শেখার পর সেখানে আমি একটি আরবী-রুশ অভিধান রচনা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার শ্বশুর একজন ধার্মিক পুরুষ ছিলেন। তাঁর একটি বড় লাইব্রেরি ছিল। সেখানে নিয়মিত অধ্যয়নের পাশাপাশি আমি পূর্ণ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কুরআন তরজমায় মনোনিবেশ করি। দামেস্ক থেকে প্রতি বছর মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি গবেষণা একাডেমির উদ্দেশ্যে সফর করতাম। একাডেমিতে ছিল একটি অনুবাদ দপ্তর। দশ পারা অনুবাদ সম্পন্ন করার পর একাডেমির আলেমগণ পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি রিভিউ কমিটি গঠন করেন। আরবী ও রুশ ভাষা জানা তিন বিজ্ঞ আরব ও দুই রাশিয়ান আলেম সদস্যের এ কমিটি খুব ভালোভাবে আমার তরজমা পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন।’
বোরোচভা উল্লেখ করেন, ‘প্রথমে এ বোর্ড তাঁর তরজমা সম্পর্কে অনেক টীকা যোগ করেন। পাশাপাশি তাঁরা অনুবাদের ভূয়সী প্রশংসাও করেন। তাঁরা বলেন, অনুবাদ হয়েছে প্রথম শ্রেণীর। এ কারণেই আমরা এর অধ্যয়ন ও মূল্যায়ন চালিয়ে যেতে পারছি। এর মধ্যে যদি অনেক ভুল-ভ্রান্তি পেতাম তবে পর্যবেক্ষণে আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারতাম না। প্রতিবারই তাঁরা অনুবাদ সম্পর্কে বৈঠকে বসতেন এবং এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করতেন।’
তিনি জানান, তাঁকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে সিরিয়ায় বসবাসের সুবাদে তা সহজেই ডিঙ্গানো সম্ভব হয়েছে। সিরিয়ার সাবেক মুফতী শায়খ আহমদ কিফতারো এবং তার পুত্র শায়খ মাহমুদ কিফতারো সবসময় তাকে সাহায্য করেছেন। প্রেরণা এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিনিয়ত অনেক বিষয়ে তাঁদের জিজ্ঞেস করেছি। প্রয়োজনীয় সব কিছুই তাঁদের কাছ থেকে জেনে নিয়েছি। তেমনি ড. যুহাইলিরও সাহায্য নিয়েছি, যার কাছে কুরআনুল কারীমের তাফসীর সংক্রান্ত অনেক কিতাব ছিল।’
তিনি যোগ করেন, ‘বহু আলেম আমাকে সাহায্য করেছেন। ‘আমি ভেলেরিয়া যদি একা একা বসে থাকতাম তাহলে কুরআনের তরজমায় অনেক ভুল হত।’ নিজের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আসমানী গ্রন্থ পবিত্র কুরআনের ভালোবাসাই আমাকে ইসলামে দীক্ষিত হতে প্রেরণা ও চেতনা জুগিয়েছে। আমার বিশ্বাস, খোলা মন নিয়ে যিনিই এ কুরআন শেষ পর্যন্ত পড়বেন, শেষাবধি তাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ বলতেই হবে।’
অনুবাদের মুদ্রণ ব্যয় সংগ্রহ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শেখ যায়েদ ইবন সুলতান (আল্লাহ তার ওপর রহম করুন) আল-আজহার একাডেমির কাছে একটি চিঠি পাঠান, তরজমা যথার্থ কি-না তিনি তা জানতে চান। নিশ্চিত হবার পর ২৫ হাজার কপি অনুবাদ ছাপার খরচ বহনে আগ্রহ প্রকাশ করেন শেখ যায়েদ। এ পর্যন্ত অর্ধ মিলিয়ন কপি অনুবাদ ছাপা হয়েছে। সৌদি আরবের শায়খ খালেদ কাসেমীও অনেক কপি ছাপিয়েছেন। লিবিয়া ও কাতার থেকেও এ অনুবাদ ছাপা হয়েছে।’  সূত্র : ইন্টারনেট

মুহাম্মাদ (সা.) এর নবুয়্যাতের মাদানী জীবন ও পর্যালোচনা

মুহাম্মাদ (সা.) এর নবুয়্যাতের মাদানী জীবন ও পর্যালোচনা

মুহাম্মাদ (সা.) এর নবুয়্যাতের মাদানী জীবন ও পর্যালোচনা

বিশ্ব ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বিজয়ের ঘটনা মক্কা বিজয়:
আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ“ তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জেহাদ করেছে তারা এবং পরবর্তীরা সমান নয়; তারা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ অন্যদের অপেক্ষা যারা পরবর্তীকালে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ্ উভয়ের জন্য কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন”। (সূরা: হাদীদ – ১০) তিনি আরো ইরশাদ করেছেনঃ “যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবে। তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তিনি তো তাওবা কবূল কারী। (সূরা: নাসর )
মহা বিজয়! কথাটি শুনলেই সকলের মনে আনন্দের জোয়ার আসে। কিন্তু এ বিজয় অর্জনের ইতিহাস বড়ই করুন! মহা বিজয়ের পূর্বের দিনগুলোর ইতিহাসের পাতা খুললেই গাঁ শিউরে ওঠে। চতুর্দিকে যুদ্ধ বিগ্রহ, রক্তপাত, মারা-মারি, হানা-হানি, জুলুম নির্যাতন, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর, অসহায় মানুষকে দাস বানিয়ে সীমাহীন কষ্ট দেয়া, নারী পুরুষ উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফসহ এমন কোন অপরাধ বাকী ছিলনা যা তৎকালীন সমাজপতিরা করেনি। সীমাহীন জুলুমের ফলে মানুষের মনুষত্য হারিয়ে বিশ্বমানবতা ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে উপনীত। আসন্ন এ ধ্বংসের হাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মুহাম্মাদ (সা.)-কে প্রেরণ করলেন। যার জন্মের সাথেই বিশ্ব অনুভব করলো যে পৃথিবীতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মুহাম্মাদ (সা.) কাল বিলম্ব না করে বিশ্ব মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করলেন। বিপন্ন মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁর এ আর্তমানবতার সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ সেই জাহেলি সমাজের সর্বস্তরের মানুষগুলো তাকে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ খেতাব ‘আল- আমীন’ উপাধি দান করলো। বিপন্ন মানুষের কল্যাণে তাঁর চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলনা। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের কাঙ্খিত শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব হলো না। অবশেষে তিনি ভাবলেন, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই পারেন কাঙ্খিত সফলতার পথ দেখাতে। তার বিধান ছাড়া কোন মানুষের ফরমুলাতেই মানুষের সব সমস্যার সমাধান দেয়া সম্ভব না। তাই তিনি ধরনা দিলেন আল্লাহর নিকটে। চলে গেলেন জাবালে নূরে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে সে শুভক্ষণ ঘনিয়ে আসলো। আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদ (সা.)-কে বিশ্ববাসীর কল্যাণের জন্য দান করলেন নবুওয়াত ও কুরআন। নতুন উদ্যোমে শুরু হলো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার মিশন।
নবুওয়াত প্রাপ্তির পরেই মক্কার কুরাইশ কাফেরগণ নানাবিধ অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে তোলে তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদেরকে। ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ, হাসি-ঠাট্টা, মিথ্যা অপবাদের তীক্ষè আঘাঁতে তাদের মানসিক অবস্থা জর্জরিত করা হয়। নবদীক্ষিত মুসলমানদেরকে তাদের মিশন থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। তাদের ঈমানী দৃঢ়তা দেখে কাফের সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণকারীদের ওপর এবার নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। ক্রমেই তারা মানসিক আঘাঁতের সাথে শারিরীক নির্যাতন শুরু করে। তৎকালীন জাহেলি সমাজের পুরাতন সে বর্বরতা সত্ত্বেও মুসলমানরা ধৈর্যচ্যুতি হননি। তারা রাসূল (সা.) এর নির্দেশে সবকিছু সহ্য করেই ইসলামী আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। অত্যাচারের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর সাথীদের গোটা পরিবারসহ আবু তালিব গিরি গুহায় বন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়। এরপরও স্বস্তি মেলেনি মুসলমানদের। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত তেরটি বছরের চরম নির্যাতন সহ্য করে মহানবী ও তাঁর সাথীদেরকে শেষ পর্যন্ত মাতৃভূমি ত্যাগ করে মদীনায় যেতে বাধ্য করা হয়। সেখানেও তাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেয়া হয়নি। হিজরতের পর হতে মুতার যুদ্ধ সময় পর্যন্ত একের পর এক যুদ্ধের মোকাবেলা করে তাদের টিকে থাকতে হয়। কখনো যুদ্ধ, কখনো সন্ধি করে এগুতে হলো। শত্রুর মোকাবেলা করেই মুসলমানগণ বিশ্ব দরবারে তাদের শক্তিমত্তার পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে মুতার যুদ্ধে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রোম সাম্রাজ্য মুসলমানদের ক্ষুদ্র একটি দলের নিকট নাস্তানাবুদ হওয়ায় সে শক্তি আরো বিকশিত হলো। এবার মুসলমানগণ শুধু প্রতিরোধ নয়, তারা আক্রমণেরও ক্ষমতা রাখে।  দশ বছর মেয়াদকাল নির্দিষ্ট করে ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধি হয়েছিলো ষষ্ট হিজরীতে। যে চুক্তির অন্যতম একটি ধারাছিল এই যে, এখন থেকে আরব গোত্রগুলোকে অধিকার দেয়া হলো যে, তারা মুসলমান অথবা কুরাইশদের যে কোন দলের সাথে মিত্রতার বন্ধনে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে। এই শর্তের ফলে বনু খোজা গোত্র মুসলমানদের সাথে আর বনু বকর কুরইশদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করলো। বনু খোজা গোত্র মক্কায় কুরাইশদের শক্তির তোয়াক্কা না করে বরং তাদের দুশমন মদীনার মুসলমানদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করায় তারা ছিল ভীষণ ক্ষুব্ধ। খোজা গোত্রকে ইসলামপন্থীদের সাথে ঐক্যমত পোষণ করায় এর প্রতিশোধ গ্রহণে তারা সদা তৎপর ছিল।
বনু বকর ও কুরাইশ কর্তৃক সন্ধির শর্ত লঙ্ঘন
চুক্তির মেয়াদ দু‘বছর অতিক্রম না হতেই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সহায়তায় বনু খোজাদের উপর রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণ করলো। ‘ওয়াতির’ নামক একটি নিভৃত পল্লীতে ছিল খোজা গোত্রের বসতি। রাতের বেলা পরিবার পরিজনসহ খোজা গোত্রের লোকেরা ঘুমে বিভোর। হঠাৎ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। কুরাইশ ও বনু বকর গোত্রের লোকেরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের ঘুমন্ত পল্লীতে আক্রমণ করলো।  আক্রমণের প্রথম আঘাতেই নিরীহ খোজাদের বহু নারী-পুরুষ ও শিশুদের প্রাণ হারালো। অনেকে বাঁচার আশায় কাবা ঘরে আশ্রয় নিলো। তখনও কাবার চারপাশে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানের দুশমন পশু চরিত্রের মানুষগুলো হায়েনার মত সেখানেও আশ্রয় নেয়া খোজাদের হত্যা করলো। (ইসলামপন্থী ও তাদের সমর্থনকারীদের হত্যার ব্যাপারে সে সময় যেমন কোন আইন-কানুনের তোয়াক্কা করতো না। ঠিক বর্তমান সভ্যসমাজের দাবীদার বিশ্ব সা¤্রাজ্য শক্তিগুলোও মুসলমানদের হত্যার ব্যাপারে একই অবস্থা আমরা দেখতে পাই। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তার চেয়েও বর্বরতা লক্ষ্য করা যায়। সে সময় যাদেরকে হত্যা করা হতো তাদেরকেই আবার এ হত্যার জন্য দোষারোপ করা হতনা। কিন্তু এখন? হত্যার পর আবার তাদেরকেই হত্যার জন্য উষ্কে দেয়ার অপবাদে জেল জুলুম সহ্য করতে হয়। এ যেন নতুন রূপী জাহেলিয়াত, পুরাতন জাহেলিয়াতকেও হার মানায়। আর তাদের এ জঘন্য কাজে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে তাদেরই টাকায় গৃহপালিত এক শ্রেণীর মুসলমান নামের কুলাঙ্গারগণ। বিনা কারণে মুসলিম অধ্যুষিত জনগণের উপর ড্রোন হামলা হয়। ইসলামকে সমর্থন করার কারণে জালিম যৌথ বাহিনীর অভিযানের স্বীকার হতে হয়। কোন অমুসলিমদের গায়ে হাত পড়লে (যা কোন মুসলমানই সমর্থন করেনা) গোটা বিশ্ব শৃগালের মত চিল্লায়। আর বিনা অপরাধে মুসলমানদের জান-মাল, বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে, সেখানে উল্টো জঙ্গিবাদের বিষ বাষ্প ছড়ায়। এখন আমাদের মাঝে রাসূল (সা.) নেই যে, আমরা তার মাধ্যমে এর প্রতিকার চাইব। রাসূল (সা.) নেই, তাতে কি হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এর প্রতিকারে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়ার আহবান করছেন। আর আল্লাহই আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী এ প্রেরণায়ই আমাদের বাঁচার উপায়। ইসলাম বর্হিভূত জীবনের চেয়ে শাহাদাতী মৃত্যু অনেক ভাল। আল্লাহ তুমি আমাদেরকে শহীদি মৃত্যু দাও!)  খোজা গোত্র কোন উপায় না দেখে এ করুণ কাহিনী রাসূল (সা.) কে অবহিত করলো এবং চুক্তি অনুযায়ী তারা রাসূলের নিকট সাহায্যের আবেদন জানালো। রাসূল (সা.) এ মর্মান্তিক ঘটনা শুনে খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি এ নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকার এবং নিম্নোক্ত তিনটি শর্তের যে কোন একটি গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে কুরাইশদের কাছে একজন দূত প্রেরণ করলেন।
ক. খোজাদের যে সব লোককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অথবা,
খ. বনু বকরের সাথে কুরাইশদের সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। অথবা,
গ. হুদায়বিয়ার সন্ধি-চুক্তি বাতিল ঘোষণা করতে হবে।
দূত মারফত এই সংবাদ শুনে ‘কোরতা বিন ওমর’ নামক জনৈক কুরাইশ বললোঃ “আমরা তৃতীয় শর্তটি সমর্থন করি”। অর্থাৎ, হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি বাতিল করা হলো। কিন্তু দূত চলে যাবার পর তারা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। কারণ, মুসলমানদের সাথে লড়াই করার মত শক্তি কুরাইশদের এখন আর আগের অবস্থানে নেই। কয়েকটা যুদ্ধে তাদের বড় মাপের অনেক বীর যোদ্ধারা মারা যাওয়ায় শক্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তাদের অর্থনীতিরও প্রায় বরোটা বেজে গেছে। তাদের সাহায্যকারী ইহুদীরা প্রায় সর্বনাশের দ্বার প্রান্তে উপনীত। অপরদিকে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র দাওয়াতী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের প্রভাব এত ব্যাপক ও শক্তিশালী করেছে যে, মক্কার আশে পাশেও তাদের সমর্থক গোত্রসমূহের একটা মজবুত অবস্থান তৈরী হয়েছে। আর নৈরাজ্যবাদী ও বিদ্রোহী শক্তিগুলোকে কঠোরভাবে দমন করে শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এমতাবস্থায় কুরাইশদের আক্রমণ করাতো দূরের কথা, আত্মরক্ষা করাও কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে হুদায়বিয়ার সন্ধিই ছিল তাদের একমাত্র রক্ষাকবচ। আর এখন সেটা নিজেরাই বাতিল করে মদীনাকে যেন আহ্বান জানালো, এস, আমাদেরকে আমাদের কুকর্মের শাস্তি দিয়ে যাও। এসব কারণেই হুদায়বিয়ার সন্ধি পুনর্বহাল করার জন্যে নিজেদের পক্ষ থেকে আবু সুফিয়ানকে প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করলো। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি, বিশেষত কুরাইশদের এতদিনকার আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল (সা.) তাদের এই নয়া প্রস্তাব সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। কারণ, যাদের চরিত্রে পশুত্বের বীজ রয়েছে তাদের বিশ্বাস করার কোনই যুক্তি নেই। তিনি আবু সুফিয়ানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। বার বার এভাবে রক্তপাত, নিরীহ মানুষ হত্যার বিভীষিকা আর কতদিন চলবে। নির্মম ও নিষ্ঠুরতার কবল থেকে পুরোপুরি ও স্থায়ীভাবে মুক্তি লাভের একটি সমাধান বের করা দরকার। আর সেটা হতে পারে শত্রুর আসল আস্তানার মূলোৎপাটন এবং জাহেলিয়াতের নেতৃত্ব তার নিজ এলাকায়ই নিভিয়ে দেয়া। এ লক্ষ্যে আক্রমনাত্বক অভিযান পরিচালনা অনিবার্য হয়ে দাড়ায়। আর এ জন্যে দায়ী বর্বর চরিত্রের কুরাইশরা, এটা তাদের কর্মফল যে, তারা নিজেরাই হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রাচীর গুড়িয়ে দিয়েছে। (চলবে)

হাদীসে রাসূল

হাদীসে রাসূল

হাদীস

 নবীর দলে এসো 
যে ব্যক্তি সত্যিকার মুসলিম, সেই নবীর দল বা নবীর উম্মতের লোক। কিন্তু যে চারটি কাজ করবেনা, সে কিন্তু নবীর দলে যাবেনা। প্রিয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “সে আমার দলের লোক নয়, যে বড়দের সম্মান ও শ্রদ্ধা করেনা, ছোটদের দয়ামায়া ও স্নেহমমতা করেনা, ভালো কাজ করতে বলেনা এবং মন্দ কাজ করতে নিষেধ করেনা।” (তিরমিযী: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত)
নিজের মর্যাদা বাড়াও
সব মানুষই চায়, নিজের মর্যাদা বাড়ুক। কিন্তু মর্যাদা কিসে বাড়ে তা কি জানো? হ্যাঁ, আমাদের প্রিয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি একদিন তাঁর সাহাবীদের জিজ্ঞেস করেন? “আমি কি তোমাদের বলবো, কিসে মানুষের মর্যাদা বাড়ায়?” তাঁরা বললেনঃ “অবশ্যি বলুন, হে আল্লাহর রাসূল!” তখন তিনি বললেন: “মর্যাদাদানকারী জিনিসগুলো হলোঃ

১. যে তোমার সাথে মূর্খের মতো ব্যবহার করবে, তুমি তার সাথে বিজ্ঞের মতো আচরণ করবে।

২. যে তোমার প্রতি অবিচার করবে, তুমি তাকে ক্ষমা করে দেবে

৩. যে তোমাকে বঞ্চিত করবে, তুমি তাকে দেবে

৪. যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, তুমি তার সাথে সম্পর্ক জুড়বে।” (তারগীব ও তারহীব : উবাদা ইবনে সামিত হতে বর্ণিত)
নবীর উপদেশ মেনে নাও
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিখ্যাত সাহাবী মুয়ায বিন জাবাল (রা.) বলেন, একদিন প্রিয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাতে ধরলেন। কিছু পথ চললেন। তারপর বললেনঃ  “মুয়ায আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছিঃ

১. আল্লাহকে ভয় করবার

২. সত্য কথা বলবার

৩. প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবার

৪. আমানত ফিরিয়ে দেবার

৫. খিয়ানত না করবার

৬. এতীমের প্রতি দয়া করবার

৭. প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করবার

৮. রাগ দমন করবার

৯. নম্র ভাষায় কথা বলবার

১০. সালাম বিনিময় করবার এবং

১১. নেতার সাথে লেগে থাকবার।” (তারগীব ও তারহীব : মুয়ায বিন জাবাল রাঃ)

মুসলমানদের অধিকার জেনে নাও
প্রিয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “মুসলমানের উপর মুসলমানের ছয়টি অধিকার আছে:

১. সাক্ষাত হলে তাকে সালাম দেবে

২. ডাকলে সাড়া দেবে

৩. উপদেশ চাইলে কল্যাণময় উদেশ দেবে

৪. হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে তুমি ‘ইয়ার হামুকাল্লাহ’ বলবে

৫. রোগাক্রান্তহলে সেবা যত্ন করবে এবং

৬. মারা গেলে তার গোসল, জানাযা, কবর ইত্যাদির ব্যবস্থা করবে।” (মুসলিম : আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত)

ব্যাখ্যাঃ এগুলো মুসলমানের উপর মুসলমানের সামাজিক অধিকার। এই পারস্পরিক অধিকারগুলো পূর্ণ করার ব্যাপারে প্রত্যেক মুসলমানেরই সচেতন থাকা উচিত। এই সব অধিকার পূর্ণ না করলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য। মুসলমানের উপর মুসলমানের অনেক অধিকার আছে। এই হাদীসে ছয়টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনের আলো

১৭৯. হে বুদ্ধি-বিবেক সম্পন্ন লোকেরা! তোমাদের জন্য কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে।১ আশা করা যায়, তোমরা এই আইনের বিরুদ্ধাচরণ করার ব্যাপারে সতর্ক হবে।
ব্যাখ্যা: ১. এটি দ্বিতীয় একটি জাহেলী চিন্তা ও কর্মের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। আগের মতো আজো বহু মস্তিস্কে এই চিন্তা দানা বেঁধে আছে। জাহেলিয়াত পন্থীদের একটি দল যেমন প্রতিশোধ গ্রহণের প্রশ্নে এক প্রান্তিকতায় চলে গেছে তেমনি আর একটি দল ক্ষমার প্রশ্নে আর এক প্রান্তিকতায় চলে গেছে এবং প্রাণদণ্ডের বিরুদ্ধে তারা এমন জবরদস্ত প্রচারণা চালিয়েছে যার ফলে অনেক লোক একে একটি ঘৃণ্য ব্যাপার মনে করতে শুরু করেছে এবং দুনিয়ার বহু দেশ প্রাণদণ্ড রহিত করে দিয়েছে। কুরআন এ প্রসঙ্গে বুদ্ধি-বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্বোধন করে তাদেরকে এই মর্মে সর্তক করে দিচ্ছে যে, কিসাস বা ‘প্রাণ হত্যার শাস্তি স্বরূপ প্রাণদণ্ডাদেশের’ ওপর সমাজের জীবন নির্ভর করছে। মানুষের প্রাণের প্রতি যারা মর্যাদা প্রদর্শন করে না তাদের প্রাণের প্রতি যারা মর্যাদা প্রদর্শন করে সে আসলে তার জামার আস্তিনে সাপের লালন করছে। তোমরা একজন হত্যাকারীর প্রাণ রক্ষা করে অসংখ্যা নিরপরাধ মানুষের প্রাণ সংকটাপন্ন করে তুলছো।
১৮০. তোমাদের কারোর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে এবং সে ধন-সম্পত্তি ত্যাগ করে যেতে থাকলে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য প্রচলিত ন্যায়নীতি অনুযায়ী অসিয়ত করে যাওয়াকে তার জন্য ফরয করা হয়েছে, মুত্তাকীদের জন্য এটা একটা অধিকার।২
ব্যাখ্যা: ২. এ বিধানটি এমন এক যুগে দেয়া হয়েছিল, যখন উত্তরাধিকার বণ্টন সম্পর্কিত কোন আইন ছিলো না। সে সময় প্রত্যেক ব্যক্তিকে অসিয়তের মাধ্যমে তার উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করে দিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এভাবে মৃত্যুর পরে পরিবারের মধ্যে কোন বিরোধ এবং কোন হকদারের হক নষ্ট হবারও ভয় থাকে না। পরে উত্তরাধিকার বন্টনের জন্য আল্লাহ নিজেই যখন একটি বিধান দিলেন (সূরা আন নিসায় এ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে) তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম ওসীয়ত ও মীরাসের বিধান ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত নিয়ম দু‘টি ব্যক্ত করলেনঃ একঃ এখন থেকে ওয়ারিসের জন্য কোন ব্যক্তি আর কোন অসিয়ত করতে পারবে না। অর্থাৎ যেসব আত্মীয়ের অংশ কুরআন নির্ধারিত করে দিয়েছে, অসিয়তের মাধ্যমে তাদের অংশ কম-বেশি করা যাবে না এবং কোন ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারীকে মীরাস থেকে বঞ্চিতও করা যাবে না। আর কোন ওয়ারিস আইনগতভাবে যা পায় অসিয়তের সাহায্যে তার চেয়ে বেশি কিছু তাকে দেয়াও যাবে না।
দুইঃ সমগ্র সম্পদ ও সম্পত্তির মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ অসিয়ত করা যেতে পারে।
এ দু‘টি ব্যাখ্যামূলক নির্দেশের পর এখন এই আয়াতের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ ওয়ারিসদের জন্য রেখে যেতে হবে। মৃত্যুর পর এগুলো মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসদের মধ্যে কুরআন নির্দেশিত বিধান অনুযায়ী বণ্টিত হবে। আর এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি মৃত ব্যক্তির তার মৃত্যুর আগে অসিয়ত করে যেতে পারে তার এমন সব আত্মীয়ের জন্য যারা তার উত্তরাধিকারী নয়। তার নিজের গৃহে বা পরিবারে যারা সাহায্য লাভের মুখাপেক্ষী অথবা পরিবারের বাইরে যাদেরকে সে সাহায্য লাভের মুখাপেক্ষী অথবা পরিবারের বাইরে যাদেরকে সে সাহায্য লাভের যোগ্য মনে করে বা যেসব জনকল্যাণমূলক কাজে সাহায্য দান করা প্রয়োজনীয় বলে সে মনে করে-এমন সব ক্ষেত্রে সে ঐ এক-তৃতীয়াংশ থেকে অসিয়ত করে যেতে পারে। (সূরা: বাকারাহ)